সংযুক্ত আরব আমিরাতের (ইউএই) প্রেসিডেন্ট শাখ মোহাম্মদ বিন জায়েদ আল নাহিয়ান রবিবার (১১ জানুয়ারি) ঢাকায় ইউএই দূতাবাসের মাধ্যমে ২৫ দণ্ডিত বাংলাদেশি নাগরিককে ক্ষমা করার সিদ্ধান্ত জানিয়ে দেন। এই পদক্ষেপটি বাংলাদেশ সরকারের আনুষ্ঠানিক অনুরোধের পর নেওয়া হয়েছে এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা তৎক্ষণাৎ মুক্তি পেয়ে দেশে ফিরে এসেছে।
দণ্ডিতদের অপরাধমূলক দায়িত্বের মূল কারণ ছিল জুলাই ২০২৪-এ বাংলাদেশে সংঘটিত প্রতিবাদে অংশগ্রহণের সময় ইউএইতে কর্মসূচি পরিচালনা করা। স্থানীয় আইন লঙ্ঘনের অভিযোগে তাদের গ্রেপ্তার, বিচার এবং দণ্ডাদেশ দেওয়া হয়। এরপর বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকার, যা ঐ সময়ের রাজনৈতিক অস্থিরতার মধ্যে কাজ করছিল, ইউএইকে ক্ষমা অনুরোধ করে।
ইউএই দূতাবাসের প্রকাশিত বিজ্ঞপ্তিতে উল্লেখ করা হয়েছে যে, বাংলাদেশ সরকারের আবেদন বিবেচনা করে প্রেসিডেন্ট দণ্ডিতদের ক্ষমা করার সিদ্ধান্ত নেন। ক্ষমাপ্রাপ্ত ২৫ জনকে অবিলম্বে মুক্তি দিয়ে বিমান মাধ্যমে বাংলাদেশে ফেরত পাঠানো হয়েছে। এই প্রক্রিয়াটি দু’দেশের কূটনৈতিক সংলাপের ফলাফল হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
বিশ্লেষকরা উল্লেখ করেন, এই ধরনের মানবিক পদক্ষেপ দু’দেশের দীর্ঘস্থায়ী বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্কের নতুন সূচক। “ইউএই এবং বাংলাদেশ দীর্ঘদিনের কৌশলগত অংশীদারিত্ব বজায় রেখেছে, বিশেষ করে অর্থনৈতিক ও নিরাপত্তা ক্ষেত্রে,” একজন আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক বিশ্লেষক বলেন। তিনি আরও যোগ করেন, দণ্ডিতদের ক্ষমা কেবল মানবিক দৃষ্টিকোণ থেকে নয়, দু’দেশের বাণিজ্যিক ও শ্রমিক সম্পর্ককে শক্তিশালী করার লক্ষ্যে নেওয়া হয়েছে।
ইউএইতে কাজ করা বাংলাদেশি শ্রমিকদের সংখ্যা লক্ষাধিক, এবং তাদের নিরাপত্তা ও অধিকার রক্ষার জন্য দু’দেশের সরকার নিয়মিত সমন্বয় করে। এই প্রেক্ষাপটে দণ্ডিতদের ক্ষমা করা শ্রমিক নীতি ও কূটনৈতিক সমঝোতার একটি অংশ হিসেবে দেখা যায়। একই সঙ্গে, এটি ইউএইয়ের আন্তর্জাতিক চিত্র উন্নত করার একটি কৌশলগত পদক্ষেপ, যা মানবাধিকার ও ন্যায়বিচার সংক্রান্ত আন্তর্জাতিক সমালোচনার প্রতিক্রিয়া হিসাবেও ব্যাখ্যা করা যায়।
পূর্বে ইউএই প্রেসিডেন্ট একই ধরনের ক্ষমা কয়েকটি দফায় প্রদান করেছেন, যখন বাংলাদেশি নাগরিকরা ইউএইতে প্রতিবাদে অংশগ্রহণের অভিযোগে দণ্ডিত হন। এই ধারাবাহিকতা দু’দেশের কূটনৈতিক সংলাপের স্থিতিশীলতা ও পারস্পরিক সমঝোতার গভীরতা নির্দেশ করে। “প্রতিটি ক্ষমা কেবল একক ঘটনা নয়, বরং দীর্ঘমেয়াদী কূটনৈতিক সম্পর্কের ধারাবাহিকতা,” আরেকজন বিশ্লেষক মন্তব্য করেন।
দণ্ডিতদের মুক্তি এবং তাদের দেশে ফেরত পাঠানোর পর, বাংলাদেশ সরকার এই ঘটনাকে কূটনৈতিক সাফল্য হিসেবে স্বীকার করেছে। সরকারী বিবৃতিতে বলা হয়েছে, এই পদক্ষেপটি দু’দেশের বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ককে আরও মজবুত করবে এবং ভবিষ্যতে শ্রমিক নিরাপত্তা, শিক্ষা ও বিনিয়োগ ক্ষেত্রে সহযোগিতা বাড়াবে।
আঞ্চলিক দৃষ্টিকোণ থেকে, এই ক্ষমা পদক্ষেপটি মধ্যপ্রাচ্য ও দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যে কূটনৈতিক ভারসাম্য রক্ষার একটি উদাহরণ হিসেবে দেখা যেতে পারে। ইউএই, যা মধ্যপ্রাচ্যের অন্যতম শক্তিশালী অর্থনৈতিক কেন্দ্র, তার কূটনৈতিক নীতি প্রায়ই মানবিক ও কৌশলগত স্বার্থের সমন্বয় করে। বাংলাদেশ, যা দ্রুত বর্ধনশীল অর্থনীতির দেশ, ইউএইকে গুরুত্বপূর্ণ বিনিয়োগকারী ও শ্রমিক গন্তব্য হিসেবে বিবেচনা করে। এই পারস্পরিক স্বার্থের ভিত্তিতে ক্ষমা সিদ্ধান্তটি দু’দেশের ভবিষ্যৎ সহযোগিতার মঞ্চ প্রস্তুত করেছে।
ভবিষ্যতে দু’দেশের কূটনৈতিক মিটিং এবং দ্বিপাক্ষিক চুক্তি আলোচনার সময় এই ধরনের মানবিক পদক্ষেপকে এক ধরণের রেফারেন্স পয়েন্ট হিসেবে ব্যবহার করা হতে পারে। বিশেষ করে শ্রমিক অধিকার, নিরাপত্তা মানদণ্ড এবং কূটনৈতিক সুরক্ষা সংক্রান্ত আলোচনায় এই ঘটনা উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রাখতে পারে। এছাড়া, আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের নজরদারিতে দু’দেশের মানবাধিকার রেকর্ড উন্নত করার জন্য আরও স্বচ্ছতা ও সহযোগিতা প্রত্যাশিত।
সারসংক্ষেপে, ইউএই প্রেসিডেন্ট শাখ মোহাম্মদ বিন জায়েদ আল নাহিয়ান ২৫ দণ্ডিত বাংলাদেশিকে ক্ষমা করে, দু’দেশের কূটনৈতিক বন্ধনকে নতুন মাত্রা দিয়েছেন। এই পদক্ষেপটি কেবল দণ্ডিতদের মুক্তি নয়, বরং ভবিষ্যতে শ্রমিক নিরাপত্তা, বাণিজ্যিক সহযোগিতা এবং কূটনৈতিক সমঝোতার জন্য একটি ইতিবাচক মডেল হিসেবে কাজ করবে।



