সংযুক্ত আরব আমিরাতের রাষ্ট্রপ্রধান শেহ জবেদ বিন জায়েদ আল নাহ্যান সম্প্রতি ২৫জন বাংলাদেশি নাগরিককে দয়া করে মুক্তি দিয়ে তাদের দেশে ফেরত পাঠানোর সিদ্ধান্ত নেন। এই পদক্ষেপটি বাংলাদেশের সরকারী অনুরোধের পর নেওয়া হয় এবং উভয় দেশের কূটনৈতিক সম্পর্কের একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
মুক্তি প্রাপ্ত ব্যক্তিরা ২০২৪ সালের জুলাই মাসে বাংলাদেশে ঘটিত প্রতিবাদ আন্দোলনের পর যুক্ত আরব আমিরাতে গ্রেফতার হয়ে আদালতে দোষী সাব্যস্ত হয়েছিলেন। সেই সময়ে কিছু বাংলাদেশি শ্রমিককে উভয় দেশের নিরাপত্তা ও শৃঙ্খলা রক্ষার নামে অপরাধী হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছিল।
বাংলাদেশ সরকার এই গ্রেফতার ও শাস্তি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে এবং মানবিক দৃষ্টিকোণ থেকে দয়া প্রার্থনা করে। সরকারী সূত্র অনুযায়ী, দয়া চাওয়ার মূল উদ্দেশ্য ছিল কষ্টভোগী শ্রমিকদের দ্রুত বাড়ি ফেরানো এবং দু’দেশের শ্রমিক নীতি সম্পর্কিত বিরোধ কমিয়ে আনা।
সংযুক্ত আরব আমিরাতের ঢাকায় অবস্থিত দূতাবাসের একটি বিবৃতি অনুযায়ী, সব ২৫জন নাগরিককে দয়া করে মুক্তি দেওয়া হয়েছে এবং তারা ইতিমধ্যে বাংলাদেশে পৌঁছে গেছেন। দূতাবাসের প্রকাশনা এই সিদ্ধান্তকে মানবিক উদ্যোগ হিসেবে তুলে ধরেছে এবং দু’দেশের বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্কের প্রতিফলন হিসেবে উল্লেখ করেছে।
দূতাবাসের বিবৃতিতে উল্লেখ করা হয়েছে যে, এই দয়া প্রদর্শন সংযুক্ত আরব আমিরাতের নেতৃত্বের সহানুভূতি, সহনশীলতা এবং ন্যায়বিচারের প্রতি অঙ্গীকারের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। এছাড়া, উভয় দেশের দীর্ঘদিনের ভাইবোনের মত সম্পর্ককে আরও দৃঢ় করার লক্ষ্যে এই পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।
কূটনৈতিক বিশ্লেষকরা বলেন, এই দয়া পদক্ষেপটি দু’দেশের বাণিজ্যিক ও শ্রমিক সম্পর্কের উন্নয়নে ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে। যুক্ত আরব আমিরাত এবং বাংলাদেশ দীর্ঘদিনের বাণিজ্যিক অংশীদারিত্ব, বিশেষত শ্রমিক রপ্তানি ও বিনিয়োগ ক্ষেত্রে ঘনিষ্ঠ সহযোগিতা বজায় রেখেছে। দয়া প্রদানের মাধ্যমে এই সহযোগিতা আরও মজবুত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
বিশেষজ্ঞরা আরও উল্লেখ করেন, এই ধরনের দয়া প্রদানের সিদ্ধান্ত শ্রমিক সম্প্রদায়ের মধ্যে নিরাপত্তা ও ন্যায়বিচার সম্পর্কে আস্থা বাড়াতে পারে। ফলে ভবিষ্যতে বাংলাদেশ থেকে যুক্ত আরব আমিরাতে কর্মসংস্থান খোঁজার প্রবণতা বাড়তে পারে এবং দু’দেশের শ্রমিক নীতি সংক্রান্ত আলোচনায় নতুন দৃষ্টিকোণ যোগ হতে পারে।
অতীতেও যুক্ত আরব আমিরাত অনুরূপ দয়া প্রদানের উদাহরণ দেখিয়েছে; ২০২২ সালে কিছু ভারতীয় শ্রমিককে দয়া করে মুক্তি দেওয়া হয়েছিল, যা আন্তর্জাতিক শ্রমিক নীতি নিয়ে আলোচনার একটি গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়। এই প্রেক্ষাপটে বর্তমান দয়া পদক্ষেপকে একটি ধারাবাহিকতা হিসেবে দেখা যায়।
দয়া প্রদানের ফলে উভয় দেশের কূটনৈতিক সংলাপের নতুন দিক উন্মোচিত হতে পারে। বাংলাদেশ সরকার সম্ভবত এই সুযোগে শ্রমিক রপ্তানি নীতি, কূটনৈতিক সুরক্ষা এবং দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য চুক্তি সংক্রান্ত আলোচনাকে ত্বরান্বিত করবে। একই সঙ্গে, যুক্ত আরব আমিরাতের মানবিক নীতি ও আন্তর্জাতিক সুনামও বাড়বে বলে অনুমান করা হচ্ছে।
পরবর্তী পর্যায়ে, বাংলাদেশ সরকার দয়া প্রাপ্ত নাগরিকদের পুনর্বাসন ও সমন্বয় প্রক্রিয়া ত্বরান্বিত করবে এবং তাদের পুনরায় কর্মসংস্থানের জন্য প্রয়োজনীয় সহায়তা প্রদান করবে। এছাড়া, দু’দেশের কূটনৈতিক মন্ত্রণালয় ভবিষ্যতে শ্রমিক সংক্রান্ত আইনি কাঠামোকে আরও স্বচ্ছ ও ন্যায়সঙ্গত করার জন্য যৌথভাবে কাজ করার সম্ভাবনা রয়েছে।
সারসংক্ষেপে, শেহ জবেদের দয়া প্রদানের সিদ্ধান্ত কেবলমাত্র মানবিক দৃষ্টিকোণ থেকে নয়, বরং কূটনৈতিক ও অর্থনৈতিক স্বার্থের সমন্বয়ে গঠিত একটি কৌশলগত পদক্ষেপ। এটি দু’দেশের দীর্ঘস্থায়ী বন্ধুত্বের নতুন দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে এবং ভবিষ্যতে আরও সমন্বিত সহযোগিতার পথ প্রশস্ত করবে।



