রবিবার সকাল থেকে মিয়ানমার‑টেকনাফ সীমান্তে গুলিবর্ষণ শুরু হয়, যার ফলে বাংলাদেশে প্রবেশের সময় ৫৪ জন রোহিঙ্গা সশস্ত্র গোষ্ঠীর সদস্যকে স্থানীয় জনগণের সহায়তায় আটক করা হয়। আটকদের হোয়াইক্যং পুলিশ ফাঁড়িতে রাখা হয়েছে; তাদের মধ্যে বেশ কয়েকজন গুলিবিদ্ধ বলে জানা যায়।
সেই গুলিবর্ষণের ফলে টেকনাফের হোয়াইক্যং ইউনিয়নের তেচ্ছিব্রিজ সীমান্ত এলাকায় ৮ বছর বয়সী আফনান নামের শিশুটি গুলিতে আহত হয়ে চমেক হাসপাতালে ভর্তি হয় এবং পরে মৃত্যুবরণ করে। শিশুর মৃত্যু সংবাদে স্থানীয় জনগণ রাগান্বিত হয়ে টেকনাফ‑কক্সবাজার সড়ক অবরোধ করে।
অবস্থানীয় নিরাপত্তা বাহিনীর সঙ্গে স্থানীয় নেতারা, যার মধ্যে জেলা বিএনপি সভাপতি শাহজাহান চৌধুরী ও জেলা জামায়াতে ইসলামী আমিনুর আহমদ আনোয়ারী অন্তর্ভুক্ত, ঘটনাস্থলে উপস্থিত হয়ে জনসাধারণকে শান্ত করার চেষ্টা করেন। তাদের হস্তক্ষেপের পর অবরোধ ধীরে ধীরে শিথিল হয়।
হোয়াইক্যং পুলিশ ফাঁড়ির ইনচার্জ উপপরিদর্শক খোকন চন্দ্র রুদ্র নিশ্চিত করেন যে গুলিবর্ষণের ফলে শিশুর মৃত্যু ঘটেছে। তিনি উল্লেখ করেন যে সীমান্তের ওপারে রখাইন রাজ্যে আরাকান আর্মি ও রোহিঙ্গা সশস্ত্র গোষ্ঠীর মধ্যে চলমান সংঘর্ষের ফলে গুলিবর্ষণ অব্যাহত রয়েছে।
মিয়ানমারের রখাইন রাজ্যে সাম্প্রতিক তিন দিন ধরে বিমান হামলা, ড্রোন আক্রমণ, মর্টার শেল ও বোমা বিস্ফোরণ বাড়ছে। মংডু টাউনশিপের আশেপাশে আরাকান আর্মি (এএ) অবস্থানে সরকারি জান্তা বাহিনীর বিমান হামলা তীব্রতর হয়েছে। একই সময়ে আরাকান স্যালভেশন আর্মি (আরসা), আরাকান রোহিঙ্গা সলিডারিটি অর্গানাইজেশন (আরএসও) এবং নবী হোসেন বাহিনীর মধ্যে পারস্পরিক গুলিবর্ষণ চলছে।
মিয়ানমার জান্তা বাহিনীরও আরাকান আর্মি অবস্থানে বোমা ও বিমান হামলা চালিয়ে যাওয়ার তথ্য পাওয়া গেছে। গুলিবর্ষণের ফলে হোয়াইক্যং এলাকায় মিয়ানমার থেকে ছোড়া গুলির শিকার হয়ে বাংলাদেশি শিশুর মৃত্যুর পর স্থানীয় বাসিন্দারা সড়ক অবরোধের মাধ্যমে প্রতিবাদ জানায়।
সীমান্তের নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে উখিয়া‑৬৪ বিজিবি ব্যাটালিয়নের অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল জহিরুল ইসলাম জানান, সীমান্তের ওপারে চলমান গুলিবর্ষণ ও অনুপ্রবেশের ঝুঁকি নজরে রাখা হয়েছে। নাফ নদী ও সীমান্তে অতিরিক্ত নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করা হয়েছে।
স্থানীয় বাসিন্দা রমজান উদ্দিনের মতে, গুলিবর্ষণ শুরুর সময় তিনি হোয়াইক্যং তেচ্ছিব্রিজ এলাকায় গলি পথে গুলির শব্দ শুনে গুলির দিক নির্ণয় করেন। তিনি উল্লেখ করেন, গুলির একটি শট তার পায়ে আঘাত করে, যা তাকে আহত করে।
আন্তর্জাতিক পর্যায়ে বাংলাদেশ‑মিয়ানমার সম্পর্কের ওপর এই সংঘর্ষের প্রভাব বাড়ছে। দু’দেশের সীমান্তে নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে দু’পক্ষের সামরিক ও পুলিশ সংস্থা সমন্বয় বাড়ানোর দাবি উত্থাপিত হয়েছে। একই সঙ্গে, জাতিসংঘের মানবাধিকার পর্যবেক্ষক দল রখাইন রাজ্যের চলমান সামরিক কার্যক্রমের মানবিক পরিণতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে এবং উভয় পক্ষকে বেসামরিক প্রাণের সুরক্ষা নিশ্চিত করতে আহ্বান জানিয়েছে।
বিশ্লেষকরা উল্লেখ করেন, টেকনাফ সীমান্তে গুলিবর্ষণ এবং রোহিঙ্গা সশস্ত্র গোষ্ঠীর উপস্থিতি বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা নীতিতে নতুন চ্যালেঞ্জ সৃষ্টি করছে। সীমান্তে অবৈধ অস্ত্র প্রবাহ ও সশস্ত্র গোষ্ঠীর কার্যক্রম নিয়ন্ত্রণের জন্য বাংলাদেশকে তার সীমানা নিরাপত্তা ব্যবস্থাকে আরও শক্তিশালী করতে হবে। একই সঙ্গে, মিয়ানমারের রখাইন রাজ্যে চলমান গৃহযুদ্ধের সমাধান না হলে সীমান্তে অনিয়ন্ত্রিত গুলিবর্ষণ অব্যাহত থাকবে বলে সতর্কতা দেওয়া হয়েছে।
প্রতিবাদ ও গুলিবর্ষণের পরিপ্রেক্ষিতে স্থানীয় প্রশাসন ও নিরাপত্তা বাহিনীর সমন্বিত পদক্ষেপে অবরোধ ভাঙা হয়েছে, তবে গুলিবর্ষণ ও সশস্ত্র গোষ্ঠীর কার্যক্রমের ঝুঁকি এখনও উচ্চ। ভবিষ্যতে সীমান্তে নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বাংলাদেশ ও মিয়ানমার উভয়ই সীমান্ত নিয়ন্ত্রণে আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকদের অংশগ্রহণ এবং দ্বিপাক্ষিক নিরাপত্তা চুক্তি পুনর্বিবেচনা করার সম্ভাবনা রয়েছে।
এই ঘটনাগুলি অঞ্চলের স্থিতিশীলতা ও মানবিক পরিস্থিতির উপর সরাসরি প্রভাব ফেলছে, এবং আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কাছ থেকে দ্রুত ও সমন্বিত প্রতিক্রিয়া প্রত্যাশিত।



