ভারতের জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা অজিত দোভাল, শনিবার অনুষ্ঠিত “বিকশিত ভারত ইয়াং লিডার্স ডায়ালগ ২০২৬” উদ্বোধনী অধিবেশনে, মোবাইল ফোন ও ইন্টারনেট ব্যবহার না করার সিদ্ধান্তের পেছনের কারণ ব্যাখ্যা করেন। অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণকারী তরুণদের প্রশ্নের জবাবে তিনি জানান, দৈনন্দিন কাজের জন্য তিনি কোনো স্মার্টফোন বা অনলাইন সেবা ব্যবহার করেন না; শুধুমাত্র পারিবারিক জরুরি প্রয়োজন বা বিদেশে থাকা কোনো ব্যক্তির সঙ্গে যোগাযোগের সময়ই ফোন ব্যবহার করেন।
এই বক্তব্যের সময় দোভাল স্পষ্ট করে বলেন, “এটা সত্য যে আমি ইন্টারনেট ব্যবহার করি না। মোবাইল ফোনও ব্যবহার করি না, শুধু পারিবারিক প্রয়োজন বা বিদেশে থাকা কারও সঙ্গে কথা বলার দরকার হলে ব্যবহার করি। প্রয়োজন অনুযায়ী আমি এভাবেই আমার কাজ পরিচালনা করি।” তিনি আরও যোগ করেন, “যোগাযোগের আরও অনেক মাধ্যম রয়েছে। কিছু অতিরিক্ত পদ্ধতির ব্যবস্থাও করতে হয়, যেগুলো সাধারণ মানুষ জানে না।”
দোভাল বর্তমানে ভারতের জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। তিনি কেরালার আইপিএস (IPS) অবসরপ্রাপ্ত কর্মকর্তা, যার গোয়েন্দা তৎপরতা, অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা ও সন্ত্রাসবাদ দমনে বহু দশকের অভিজ্ঞতা রয়েছে। ১৯৪৫ সালে উত্তরাখণ্ডে জন্মগ্রহণ করে, ১৯৬৮ সালে তিনি আইপিএসে যোগ দেন এবং সাহসিকতার জন্য কীর্তি চক্র পুরস্কারপ্রাপ্ত সর্বকনিষ্ঠ পুলিশ কর্মকর্তা হন।
ক্যারিয়ার জুড়ে দোভাল মিজোরাম, পাঞ্জাব ও উত্তর-পূর্ব ভারতের বিভিন্ন অঞ্চলে বিদ্রোহ দমন অভিযানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। তার নেতৃত্বে পরিচালিত অপারেশনগুলোতে সশস্ত্র গোষ্ঠীর কার্যক্রম দমন এবং শাসন কাঠামো শক্তিশালী করার লক্ষ্যে বহু সফল পদক্ষেপ নেওয়া হয়।
জাতীয় নিরাপত্তা সংক্রান্ত বড় সিদ্ধান্তগুলিতে দোভালের প্রভাবও উল্লেখযোগ্য। ২০১৬ সালের সার্জিক্যাল স্ট্রাইক পরিকল্পনা ও বাস্তবায়নে তিনি মূল ভূমিকা রাখেন, যা পাকিস্তানের সীমান্তে সশস্ত্র গোষ্ঠীর অবকাঠামো ধ্বংসের লক্ষ্যে পরিচালিত হয়। একইভাবে, ২০১৯ সালের বালাকোট বিমান হামলায়ও তার পরামর্শ ও কৌশলগত দৃষ্টিভঙ্গি গুরুত্বপূর্ণ ছিল।
দোভাল ডোকলাম স্ট্যান্ডঅফের সময় ভারতের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা নীতির রূপরেখা তৈরিতে অংশ নেন, যেখানে সীমান্তে চীনা সেনাবাহিনীর সঙ্গে উত্তেজনা নিয়ন্ত্রণের জন্য বিকল্প কূটনৈতিক ও সামরিক পদ্ধতি নির্ধারণ করা হয়। এছাড়া, ১৯৯৯ সালে কান্দাহারে আইসি-৮১৪ বিমান ছিনতাই সংকটের সময় আলোচক দলের একজন সদস্য হিসেবে তিনি আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক আলোচনায় অংশ নেন।
দোভালের এইসব অভিজ্ঞতা তাকে ডিজিটাল প্রযুক্তি থেকে দূরে থাকা একটি কৌশলগত পছন্দ গ্রহণে প্রভাবিত করেছে। তিনি যুক্তি দেন, গোপনীয়তা ও নিরাপত্তা রক্ষার জন্য প্রচলিত যোগাযোগের বাইরে অতিরিক্ত পদ্ধতি ব্যবহার করা প্রয়োজন, যা সাধারণ নাগরিকদের কাছে অজানা থাকতে পারে। এই দৃষ্টিভঙ্গি তার কাজের গোপনীয়তা বজায় রাখতে এবং তথ্য লিকেজের ঝুঁকি কমাতে সহায়ক বলে তিনি উল্লেখ করেন।
বিশেষজ্ঞরা উল্লেখ করেন, দোভালের এই ডিজিটাল অনুপস্থিতি নিরাপত্তা নীতিতে একটি বিরল উদাহরণ, যেখানে উচ্চ পর্যায়ের কর্মকর্তা ব্যক্তিগতভাবে প্রযুক্তি ব্যবহার না করে কাজের ধারাবাহিকতা বজায় রাখেন। তার এই পদ্ধতি ভবিষ্যতে অন্যান্য নিরাপত্তা সংস্থার জন্য রেফারেন্স পয়েন্ট হতে পারে, বিশেষত সাইবার হুমকি ও তথ্য ফাঁসের ঝুঁকি বাড়ার প্রেক্ষাপটে।
দোভালের বক্তব্যের পর, ডায়ালগের অংশগ্রহণকারীরা তার নিরাপত্তা নীতি ও যোগাযোগের পদ্ধতি সম্পর্কে প্রশ্ন করে, যা নিরাপত্তা ক্ষেত্রে প্রযুক্তি নির্ভরতা ও গোপনীয়তার ভারসাম্য নিয়ে আলোচনার সূচনা করে। ভবিষ্যতে তার মতামত ও অভিজ্ঞতা ভারতের নিরাপত্তা নীতি গঠনে প্রভাব ফেলতে পারে, বিশেষত ডিজিটাল সাইবার নিরাপত্তা ও গোপনীয়তা রক্ষার ক্ষেত্রে।
সারসংক্ষেপে, অজিত দোভাল তার দীর্ঘমেয়াদী গোয়েন্দা ও নিরাপত্তা কর্মজীবনের ভিত্তিতে মোবাইল ও ইন্টারনেট ব্যবহার না করার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। তিনি বিশ্বাস করেন, বিকল্প যোগাযোগ পদ্ধতি ও গোপনীয়তা বজায় রাখা দেশের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার অন্যতম মূল উপাদান। তার এই পদ্ধতি দেশের নিরাপত্তা কাঠামোর মধ্যে প্রযুক্তি ব্যবহার ও গোপনীয়তা রক্ষার মধ্যে একটি নতুন দৃষ্টিকোণ উপস্থাপন করছে।



