থাকুরগাঁও সদর উপজেলা সোনাপাটিলা গ্রামে গতকাল এক দিনের শাক পিটারি উৎসব অনুষ্ঠিত হয়। এই গ্রামীণ সমাবেশে স্থানীয় বাসিন্দা, বিশেষ করে বয়স্ক নারী ও শিশুদের অংশগ্রহণে বন্য শাকসবজির জ্ঞান ও রেসিপি তরুণ প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দেওয়া হয়।
উৎসবের মূল আকর্ষণ ছিল সমবেত খাবার, ঐতিহ্যবাহী গানের সুর, চিত্রকলা ও স্থানীয় চলচ্চিত্রের প্রদর্শনী। পুরো দিন জুড়ে বন্য শাক দিয়ে তৈরি খাবার, সেসব শাকের চিত্রকর্ম এবং সেগুলোর পুষ্টিকর গুণাবলী নিয়ে আলোচনা করা হয়।
এই উদ্যোগের মূল লক্ষ্য হল বয়স্ক নারীদের হাতে সঞ্চিত বন্য শাকের ব্যবহারিক জ্ঞানকে সংরক্ষণ করা এবং তা নতুন প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দেওয়া। আধুনিক কৃষি পদ্ধতি ও পরিবেশগত পরিবর্তনের ফলে ঐতিহ্যবাহী খাদ্য সংস্কৃতি হুমকির মুখে রয়েছে, তাই এই ধরনের সমাবেশের মাধ্যমে জ্ঞানভান্ডারকে জীবিত রাখা সম্ভব।
শাক পিটারি উৎসবের আয়োজন গিদ্রি বাওলি ফাউন্ডেশন অফ আর্টস এবং ব্রিটিশ কাউন্সিলের যৌথ উদ্যোগে করা হয়েছে। উভয় সংস্থা মিলিতভাবে বন্য শাকের ঐতিহ্যবাহী ব্যবহারকে পুনরুজ্জীবিত করার জন্য প্রশিক্ষণ, কর্মশালা এবং সম্প্রদায়িক কার্যক্রম চালু করেছে।
উৎসবের কেন্দ্রীয় অংশ ছিল সমবেত ভোজ, যেখানে গ্রামটির প্রায় সব বাড়ি থেকে নারীরা বন্য শাক ও ঘরে স্বাভাবিকভাবে বেড়ে ওঠা অন্যান্য উপাদান দিয়ে তৈরি খাবার নিয়ে এসেছেন। প্রতিটি পরিবার তাদের নিজস্ব রেসিপি ও স্বাদ যোগ করে একটি বিশাল খাবারের মেলা গড়ে তুলেছে।
প্রতিটি খাবারকে আলাদা স্টলে সাজিয়ে দর্শকদের সামনে উপস্থাপন করা হয়। খাবার প্রস্তুতকারীরা শাকের সংগ্রহ, পরিষ্কার, রান্নার পদ্ধতি এবং তার পুষ্টিকর গুণাবলী সম্পর্কে সরাসরি ব্যাখ্যা দেন। এতে উপস্থিত দর্শকরা শাকের স্বাদ ও স্বাস্থ্য উপকারিতা সম্পর্কে সরাসরি শিখতে পারেন।
দুপুরের পরিদর্শনে দেখা যায়, নারীরা ছোট ছোট পাত্রে বন্য শাকের রান্না পরিবেশন করছেন, মোট ৪০টিরও বেশি ভিন্ন ভিন্ন শাকের পদ দেখা গিয়েছে। এই বৈচিত্র্যই উৎসবের মূল আকর্ষণ, যা বন্য শাকের সমৃদ্ধি ও তার ব্যবহারিক সম্ভাবনা তুলে ধরে।
শিশুদের চিত্রকর্মও একইভাবে মনোযোগের কেন্দ্রে ছিল। গ্রামীয় শিশুরা শাকের পাতা, গাছের ডালপালা এবং তাদের রান্না করা খাবারকে ক্যানভাসে রূপান্তরিত করেছেন। এই শিল্পকর্মগুলো শাকের বৈচিত্র্য, পুষ্টি এবং ঐতিহ্যবাহী ব্যবহারকে চিত্রায়িত করেছে।
সোনাপাটিলা গ্রাম থেকে পার্বতী রানি নামের এক নারী ছয়টি ভিন্ন শাকের পদ নিয়ে অংশগ্রহণ করেন। তিনি উল্লেখ করেন, পূর্বে বাংলার গ্রামাঞ্চলে শাকের ব্যবহার ব্যাপক ছিল এবং কালী পূজার আগে হিন্দু সম্প্রদায়ের মানুষ প্রায় চৌদ্দটি ভিন্ন শাকের পদ খেত। এই ঐতিহ্য আজ শহুরে সংস্কৃতিতে ধীরে ধীরে হারিয়ে যাচ্ছে।
শহুরে জীবনধারা ও আধুনিক খাবারের প্রবণতা বন্য শাকের ব্যবহারকে কমিয়ে দিয়েছে। বিশেষ করে তরুণ প্রজন্মের মধ্যে শাকের প্রতি আগ্রহ হ্রাস পেয়েছে, ফলে ঐতিহ্যবাহী রেসিপি ও জ্ঞান প্রজন্মান্তরে সঠিকভাবে পৌঁছাতে পারছে না।
আয়ুর্বেদে বন্য শাকের ব্যবহারকে বহু প্রজন্মের স্বাস্থ্যকর খাদ্য হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। এই ঐতিহ্যবাহী জ্ঞানকে পুনরুজ্জীবিত করতে এবং পরিবেশগত চ্যালেঞ্জের মুখে খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে শাক পিটারি উৎসবের মতো উদ্যোগের গুরুত্ব অপরিসীম।



