গৃহস্থালি ও আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের কেন্দ্রবিন্দু হিসেবে চট্টগ্রামকে উঁচুতে তুলতে, জিপিএইচ ইস্পাত লিমিটেডের অতিরিক্ত ব্যবস্থাপনা পরিচালক আলমাস শিমুল রেডিসন ব্লু চট্টগ্রাম বে ভিউতে অনুষ্ঠিত একটি গোলটেবিল বৈঠকে সরাসরি দাবি জানিয়েছেন। তিনি উল্লেখ করেন, বাণিজ্যিক রাজধানী চট্টগ্রাম হলে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের উপস্থিতি ও সমন্বয়ও এখানেই হওয়া উচিত।
বৈঠকটি প্রথম আলো দ্বারা আয়োজিত এবং গৃহীত সমর্থনকারী সংস্থাগুলোর মধ্যে জিপিএইচ ইস্পাত, আবুল খায়ের গ্রুপ এবং টিকে গ্রুপ অন্তর্ভুক্ত। আলোচনার মূল বিষয় ছিল চট্টগ্রামকে বাণিজ্যিক হাব হিসেবে গড়ে তোলার জন্য প্রয়োজনীয় অবকাঠামো ও নীতি নির্ধারণ।
শিমুলের মতে, পূর্বে চট্টগ্রাম‑চিয়াংমাই‑ব্যাংকক রুটে চলা ফ্লাইটটি বন্ধ হয়ে গেছে। তিনি জোর দিয়ে বলেন, যদি এই রুটটি সপ্তাহে একবার হলেও পুনরায় চালু করা যায়, তবে বিদেশি ক্রেতা ও ব্যবসায়িক অংশীদারদের জন্য চট্টগ্রাম থেকে সরাসরি গন্তব্যে পৌঁছানো সহজ হবে। একইভাবে, ঢাকা‑চট্টগ্রাম‑সিঙ্গাপুর রুটের ফ্লাইটও বন্ধ হওয়ায় আন্তর্জাতিক সংযোগে বড় ফাঁক তৈরি হয়েছে।
আলমাস শিমুল পুনরায় চালু হওয়া ফ্লাইটগুলোকে চট্টগ্রামের বাণিজ্যিক অবস্থান শক্তিশালী করার মূল চাবিকাঠি হিসেবে উপস্থাপন করেন। তিনি উল্লেখ করেন, এ ধরনের সংযোগ না থাকলে বিদেশি বিনিয়োগকারী ও রপ্তানিকারকরা অন্য বন্দর বা শহরে ঝুঁকে যাবে, যা দেশের রপ্তানি সম্ভাবনাকে ক্ষতিগ্রস্ত করবে।
বৈঠকে তিনি উন্নয়ন মন্ত্রণালয়ের ভূমিকা ও সমন্বয়ের প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরেন। শিমুলের মতে, বর্তমান সময়ে মন্ত্রী ও মেয়রসহ উচ্চপদস্থ কর্মকর্তারা অন্যান্য স্টেকহোল্ডারদের সঙ্গে সমন্বয় করতে অনিচ্ছুক, ফলে নীতি বাস্তবায়নে বাধা সৃষ্টি হচ্ছে। তিনি এ বিষয়ে স্পষ্ট করেন, সমন্বয়ের অভাবে পরিকল্পনা বাস্তবায়ন কঠিন হয়ে পড়ে।
চট্টগ্রামের অবকাঠামো উন্নয়নের দিক থেকে শিমুল ঢাকা‑চট্টগ্রাম মহাসড়কের বর্তমান অবস্থা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, আগামী দুই থেকে পাঁচ বছরের মধ্যে এই মহাসড়ক অতিরিক্ত লোডের কারণে ধ্বংসের কাছাকাছি পৌঁছাবে, যা বাণিজ্যিক লজিস্টিক্সে বড় বাধা সৃষ্টি করবে।
এদিকে, নদী ও সমুদ্রপথের ব্যবহার বাড়ানোর প্রস্তাবও শিমুলের আলোচনার অংশ। তিনি উল্লেখ করেন, চট্টগ্রাম থেকে উৎপাদিত পণ্যসম্ভার বর্তমানে প্রধানত মহাসড়কের ওপর নির্ভরশীল, যা সময় ও ব্যয়ের দিক থেকে অপ্রতিযোগিতামূলক।
সীতাকুণ্ডে একটি অভ্যন্তরীণ নদীবন্দর গড়ে তোলার পরিকল্পনা শিমুলের মতে চট্টগ্রামের বাণিজ্যিক ক্ষমতা বাড়াতে গুরুত্বপূর্ণ। তিনি উল্লেখ করেন, সীতাকুণ্ডের নদীবন্দর থেকে চট্টগ্রাম পর্যন্ত দূরত্ব মাত্র ৬৫ কিলোমিটার, যা রেল বা সড়ক পরিবহনের তুলনায় দ্রুত ও সাশ্রয়ী বিকল্প হতে পারে।
শিমুলের মতে, নদী ও সমুদ্রপথের সমন্বয় কেবল লজিস্টিক্সের খরচ কমাবে না, বরং দেশের বাণিজ্যিক নেটওয়ার্ককে বৈশ্বিক মানের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ করবে। তিনি এ বিষয়ে জোর দেন যে, সংযোগ বাড়াতে না পারলে চট্টগ্রামের বাণিজ্যিক গুরুত্ব বাড়বে না।
বৈঠকের অংশগ্রহণকারীরা শিমুলের প্রস্তাবের প্রতি ইতিবাচক সাড়া দেন এবং সমন্বিত নীতি গঠনের জন্য প্রয়োজনীয় পদক্ষেপের ওপর আলোচনা চালিয়ে যান। তারা উল্লেখ করেন, ফ্লাইট পুনরায় চালু করা, নদীবন্দর গঠন এবং মহাসড়কের বিকল্প রুট উন্নয়ন একসাথে করলে চট্টগ্রামকে বাণিজ্যিক রাজধানী হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব হবে।
শিমুল শেষ মন্তব্যে বলেন, চট্টগ্রামের কনেক্টিভিটি উন্নত না হলে বাণিজ্যিক গুরুত্ব বাড়বে না, এবং কনেক্টিভিটি বাড়াতে হলে বহুমুখী পরিবহন ব্যবস্থা গড়ে তোলা জরুরি। তিনি ভবিষ্যতে সরকার, বেসরকারি সংস্থা এবং স্থানীয় ব্যবসায়িক গোষ্ঠীর সমন্বিত প্রচেষ্টা দাবি করেন।
এই আলোচনার মূল লক্ষ্য হল চট্টগ্রামকে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের গেটওয়ে হিসেবে গড়ে তোলা, যাতে দেশীয় ও বিদেশি ব্যবসা উভয়ই সমৃদ্ধি লাভ করে। শিমুলের আহ্বান অনুযায়ী, ফ্লাইট পুনরায় চালু, নদীবন্দর গঠন এবং মহাসড়কের বিকল্প রুটের মাধ্যমে চট্টগ্রামের বাণিজ্যিক সম্ভাবনা সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছাতে পারে।



