ঢাকা‑চট্টগ্রাম মহাসড়কে আট বা দশ লেনের পরিকল্পনা চালু হলে দেশের দুই প্রধান নগরীর মধ্যে পরিবহন ক্ষমতা উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়বে, এ বিষয়ে চুয়েটের নগর ও অঞ্চল‑পরিকল্পনা অনুষদের ডিন রাশিদুল হাসান স্পষ্ট ধারণা দেন। বর্তমানে ৫৯২টি নগর কেন্দ্র থাকা সত্ত্বেও, দেশের নগর জনসংখ্যার প্রায় ষাট শতাংশ মাত্র চারটি শহরে কেন্দ্রীভূত, যার মধ্যে ঢাকা ও চট্টগ্রাম সর্বোচ্চ ভাগীদার। ঢাকা শহরে প্রায় ত্রিশ থেকে চল্লিশ শতাংশ মানুষ বাস করে, আর চট্টগ্রাম মহানগরে প্রায় বারো শতাংশ। এই ঘনবসতিপূর্ণ গঠনকে বিবেচনা করে, মহাসড়কের লেন বৃদ্ধি সরাসরি বাণিজ্যিক প্রবাহ ও লজিস্টিক্সের দক্ষতা বাড়াবে বলে আশা করা হচ্ছে।
রাশিদুল হাসান উল্লেখ করেন, লেন সংখ্যা বাড়লে গতি সীমা বৃদ্ধি পাবে, যানজট কমবে এবং ট্রাক‑বেসড পণ্য পরিবহন সময় হ্রাস পাবে। ফলে দেশের অভ্যন্তরীণ বাজারে পণ্যের সরবরাহ দ্রুত হবে, যা উৎপাদন খাতের লজিস্টিক খরচ কমিয়ে মুনাফা বাড়াতে সহায়তা করবে। বিশেষ করে রপ্তানি‑নির্ভর শিল্প ও জাহাজবন্দরের কাছাকাছি অবস্থিত শিল্পকেন্দ্রগুলো এই উন্নয়ন থেকে সরাসরি উপকৃত হবে।
গোলটেবিল বৈঠকে স্বাগত বক্তব্যে প্রথম আলো সম্পাদক মতিউর রহমান অতীতের নীতিগত পদক্ষেপগুলো স্মরণ করিয়ে দেন। ১৯৯২ সালে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া চট্টগ্রামকে বাণিজ্যিক রাজধানী হিসেবে গড়ে তোলার ইচ্ছা প্রকাশ করেন। এরপর ২০০৩ সালের জানুয়ারি মন্ত্রিসভা বৈঠকে চট্টগ্রামকে বাণিজ্যিক কেন্দ্রের দিকে উন্নীত করার জন্য ষোলোটি মূল কর্মসূচি উপস্থাপন করা হয়। তবে সেই পরিকল্পনাগুলো বাস্তবায়নে স্পষ্ট অগ্রগতি না হওয়ায় এখনো চূড়ান্ত ফলাফল দেখা যায়নি।
মতিউর রহমানের মতে, গত নভেম্বর মাসে চট্টগ্রামে অনুষ্ঠিত একটি বড় ইভেন্টে ব্যবসায়িক প্রতিনিধিরা চট্টগ্রামের ভবিষ্যৎ দিকনির্দেশনা নিয়ে তীব্র আলোচনা চালিয়ে গেছেন। তারা চট্টগ্রামকে দ্বিতীয় রাজধানী হিসেবে গড়ে তোলার দাবি তুলে ধরেছেন এবং নির্বাচনের আগে এই বিষয়টি সরকারী এজেন্ডায় অন্তর্ভুক্ত করার আহ্বান জানিয়েছেন। প্রায় পনেরো বছর আগে বাংলাদেশ চেম্বার অব কমার্সের সঙ্গে একই বিষয়ে আলোচনা হয়েছিল, যেখানে চেম্বার প্রতিনিধিরা সরকারকে উদ্যোগ নিতে এবং নির্বাচনের পূর্বে বিষয়টি উন্মোচন করতে অনুরোধ করেন।
বাণিজ্যিক সংযোগের দৃষ্টিকোণ থেকে লেন বৃদ্ধি দেশের অভ্যন্তরীণ বাজারের একীকরণকে ত্বরান্বিত করবে। বর্তমান সময়ে ঢাকা‑চট্টগ্রাম রুটে গড়ে ১২০,০০০ গাড়ি চলাচল করে, যার মধ্যে ট্রাকের সংখ্যা উল্লেখযোগ্য। লেন বাড়লে এই গাড়ির প্রবাহে স্বচ্ছতা ও নিরাপত্তা বৃদ্ধি পাবে, ফলে দুর্ঘটনা ও বিলম্বের ঝুঁকি কমবে। লজিস্টিক্স কোম্পানিগুলো দ্রুত ডেলিভারি সময়ের মাধ্যমে গ্রাহক সন্তুষ্টি বাড়াতে পারবে, যা শেষ পর্যন্ত বাজারে প্রতিযোগিতামূলক সুবিধা এনে দেবে।
অধিকন্তু, উন্নত মহাসড়ক নেটওয়ার্ক চট্টগ্রাম বন্দরকে আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের হাব হিসেবে শক্তিশালী করবে। বন্দর থেকে দেশের অভ্যন্তরে পণ্য পরিবহনের সময় কমে গেলে রপ্তানি পণ্যের প্রতিযোগিতামূলক মূল্য বজায় থাকবে, ফলে রপ্তানি আয় বৃদ্ধি পাবে। একই সঙ্গে, চট্টগ্রাম অঞ্চলে নতুন শিল্প পার্ক ও লজিস্টিক সেন্টার গড়ে তোলার সম্ভাবনা বাড়বে, যা স্থানীয় কর্মসংস্থান ও বিনিয়োগ আকর্ষণে ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে।
অর্থনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে দেখা যায়, লেন বৃদ্ধি প্রকল্পের জন্য প্রয়োজনীয় মূলধন ও নির্মাণ কাজের মাধ্যমে স্বল্পমেয়াদে নির্মাণ খাতের চাহিদা বাড়বে। এই ধরণের অবকাঠামো প্রকল্প সাধারণত বহু সেক্টরে সরবরাহ শৃঙ্খলকে সক্রিয় করে, ফলে উপকরণ সরবরাহকারী, যন্ত্রপাতি নির্মাতা এবং সেবা প্রদানকারী প্রতিষ্ঠানগুলোও উপকৃত হবে। দীর্ঘমেয়াদে, উন্নত সংযোগের ফলে রিয়েল এস্টেট মূল্যে উত্থান, বাণিজ্যিক এলাকার সম্প্রসারণ এবং নগর পরিকল্পনার পুনর্গঠন ঘটতে পারে।
সারসংক্ষেপে, ঢাকা‑চট্টগ্রাম মহাসড়কে লেন বাড়ানোর পরিকল্পনা শুধু যাতায়াতের সময় কমাবে না, বরং দেশের বাণিজ্যিক কাঠামোকে শক্তিশালী করে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ত্বরান্বিত করবে। তবে বাস্তবায়নের জন্য নীতি নির্ধারক, বিনিয়োগকারী এবং সংশ্লিষ্ট সেক্টরের সমন্বিত প্রচেষ্টা প্রয়োজন, যাতে পরিকল্পনা সময়মতো সম্পন্ন হয় এবং প্রত্যাশিত বাজারগত সুবিধা অর্জিত হয়।



