একটি সাম্প্রতিক বৈজ্ঞানিক সমীক্ষা প্রকাশ করেছে যে, প্রতিদিন প্রায় সাত হাজার পদক্ষেপ নেওয়া স্বাস্থ্যের জন্য উল্লেখযোগ্য সুরক্ষা প্রদান করে। গবেষণাটি ল্যানসেট পাবলিক হেলথ জার্নালে প্রকাশিত হয়েছে এবং এতে ১.৬ লক্ষেরও বেশি প্রাপ্তবয়স্কের তথ্য বিশ্লেষণ করা হয়েছে। মূল লক্ষ্য ছিল কতটুকু হাঁটা স্বাস্থ্য ঝুঁকি হ্রাসে সহায়ক, তা নির্ধারণ করা।
দশ হাজার পদক্ষেপের লক্ষ্য বহু বছর ধরে ফিটনেস পরামর্শের মানদণ্ড হিসেবে প্রচলিত, যদিও বৈজ্ঞানিক সমর্থন সীমিত। নতুন বিশ্লেষণ দেখায় যে, সাত হাজার পদক্ষেপই অধিকাংশ মানুষের জন্য যথেষ্ট, এবং এটি অর্জনযোগ্য লক্ষ্য হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।
সমীক্ষায় অন্তর্ভুক্ত গবেষণাগুলো বিভিন্ন দেশ ও বয়স গোষ্ঠীর তথ্য একত্রিত করেছে, ফলে ফলাফলগুলো ব্যাপকভাবে প্রযোজ্য। বিশ্লেষণের ফলাফল অনুযায়ী, যারা দৈনিক প্রায় সাত হাজার পদক্ষেপ নেয়, তাদের মৃত্যুর ঝুঁকি উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যায়, বিশেষ করে কম পদক্ষেপ নেওয়া ব্যক্তিদের তুলনায়।
এছাড়া, নিয়মিত এই পরিমাণে হাঁটা হৃদরোগ, টাইপ ২ ডায়াবেটিস, কিছু প্রকারের ক্যান্সার, ডিপ্রেশন, ডিমেনশিয়া এবং পতনের ঝুঁকি কমাতে সহায়তা করে। এই রোগগুলোতে ঝুঁকি হ্রাসের মাত্রা গবেষণার বিভিন্ন অংশে সমানভাবে দেখা গেছে।
অত্যন্ত কম সক্রিয় মানুষদের জন্যও ফলাফল আশাব্যঞ্জক। যারা দৈনিক দুই হাজারের কাছাকাছি পদক্ষেপ নিত, তাদের তুলনায় চার হাজার পদক্ষেপে বৃদ্ধি পেলে স্বাস্থ্যের উন্নতি স্পষ্ট হয়েছে। অর্থাৎ, ছোটো পরিবর্তনও বড় পার্থক্য তৈরি করতে পারে।
বেশিরভাগ স্বাস্থ্য সূচকে সাত হাজার পদক্ষেপের পর উন্নতি ধীরে ধীরে স্থবির হয়ে যায়। অর্থাৎ, অতিরিক্ত পদক্ষেপ নেওয়া সব ক্ষেত্রে অতিরিক্ত সুবিধা দেয় না, যদিও কিছু ক্ষেত্রে, বিশেষ করে হৃদরোগে, সাত হাজারের উপরে যাওয়ায় অতিরিক্ত সুরক্ষা পাওয়া যায়।
হৃদরোগের ক্ষেত্রে, পদক্ষেপের সংখ্যা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে ঝুঁকি হ্রাসের প্রবণতা অব্যাহত থাকে, যা নির্দেশ করে যে হৃদস্বাস্থ্যের জন্য উচ্চ মাত্রার শারীরিক ক্রিয়াকলাপ এখনও উপকারী। তবে, অন্যান্য রোগের ক্ষেত্রে সাত হাজারের পর লাভের হার কমে যায়।
এই গবেষণার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দিক হল এর ব্যবহারিকতা। দশ হাজার পদক্ষেপের লক্ষ্য অনেকের জন্য অপ্রাপ্য বা ভয়ঙ্কর মনে হতে পারে, বিশেষ করে বয়স্ক, দীর্ঘস্থায়ী রোগে আক্রান্ত বা বর্তমানে নিষ্ক্রিয় ব্যক্তিদের জন্য। সাত হাজারের লক্ষ্য অধিকাংশ মানুষের দৈনন্দিন রুটিনে সহজে অন্তর্ভুক্ত করা সম্ভব।
প্রতিদিনের ছোটো হাঁটা অভ্যাস গড়ে তোলা মানসিকভাবে সহজ, ফলে মানুষ মোটিভেশন হারিয়ে না গিয়ে ধারাবাহিকভাবে চলাফেরা বজায় রাখতে পারে। লক্ষ্যটি অর্জনযোগ্য হলে স্বাস্থ্যের প্রতি ইতিবাচক মনোভাব গড়ে ওঠে এবং দীর্ঘমেয়াদে সক্রিয় জীবনধারা বজায় থাকে।
দশ হাজার পদক্ষেপের প্রচলিত ধারণা থেকে সরে এসে, সাত হাজারের বাস্তবসম্মত লক্ষ্য নির্ধারণ করলে অধিকাংশ মানুষ নিয়মিত শারীরিক কার্যকলাপের দিকে মনোযোগ দিতে উৎসাহিত হবে। এটি বিশেষত শহুরে পরিবেশে বসে কাজ করা কর্মচারী ও বাড়িতে বসে সময় কাটানো পরিবারের জন্য উপকারী।
বিশেষজ্ঞরা পরামর্শ দেন যে, দৈনিক পদক্ষেপের সংখ্যা ধীরে ধীরে বাড়ানো উচিত; প্রথমে লক্ষ্য হতে পারে চার থেকে পাঁচ হাজার, তারপর ধীরে ধীরে সাত হাজারের দিকে অগ্রসর হওয়া। এই পদ্ধতি শরীরকে অতিরিক্ত চাপ না দিয়ে স্বাস্থ্যের উন্নতি নিশ্চিত করে।
সারসংক্ষেপে, নতুন গবেষণার ফলাফল দেখায় যে, প্রতিদিনের হাঁটা দূরত্বে সামান্য পরিবর্তনই বড় স্বাস্থ্যগত সুবিধা এনে দিতে পারে। সাত হাজার পদক্ষেপের লক্ষ্য অর্জন করলে মৃত্যুর ঝুঁকি কমে, পাশাপাশি হৃদরোগ, ডায়াবেটিস ও অন্যান্য গুরুতর রোগের সম্ভাবনা হ্রাস পায়।
আপনার দৈনন্দিন রুটিনে ছোটো পরিবর্তন আনার মাধ্যমে আপনি কীভাবে স্বাস্থ্যকর জীবনযাপনকে সহজ করে তুলতে পারেন, তা নিয়ে ভাবুন এবং আজই আপনার পদক্ষেপের লক্ষ্য নির্ধারণ করুন।



