ত্রিপুরার উনকোটি জেলার কুমারঘাট, ফটিকরয় থানা এলাকায় ২৪ জানুয়ারি রাত থেকে শুরু হওয়া চাঁদা সংগ্রহের বিবাদে দুই সম্প্রদায়ের মধ্যে তীব্র সংঘর্ষে অন্তত পাঁচ থেকে ছয়জন আহত হয়। ঘটনাস্থলে বেশ কয়েকটি বাড়ি ও দোকান পুড়ে যায় এবং একটি উপাসনালয়ও ধ্বংস হয়। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে সরকার ইন্টারনেট সেবা ৪৮ ঘণ্টা বন্ধ করে এবং নিরাপত্তা বাহিনীর মোতায়েন বাড়ায়।
বিবাদের মূল কারণ ছিল স্থানীয় ব্যবসায়ী মোসাব্বির আলীর কাছ থেকে পুজো ও মেলার চাঁদা আদায়ের দাবি। চাঁদা সংগ্রহের সময় দুই সম্প্রদায়ের মধ্যে তর্ক বাড়ে এবং দ্রুতই শারীরিক হিংসায় রূপ নেয়। প্রথমে মৌখিক বিরোধের পর উভয় পক্ষের লোকজন গুলিবিদ্ধ হয়ে গিয়ে কাঠের দোকান, বাড়ি ও অন্যান্য স্থাপনা জ্বালিয়ে দেয়।
অগ্নিকাণ্ডের ফলে কুমারঘাটের বেশ কয়েকটি ঘর ও দোকান সম্পূর্ণ ধ্বংস হয়, কিছু বাড়িতে আগুন ধরে পুরো কাঠামো পুড়ে যায়। পাশাপাশি একটি স্থানীয় উপাসনালয়েও ভাঙচুরের কাজ হয়, যা স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যে আতঙ্কের সৃষ্টি করে। আহতদের মধ্যে গুরমার, গৃহিণী ও শিশু অন্তর্ভুক্ত, যাদের জরুরি চিকিৎসা সেবা প্রদান করা হয়।
অবস্থা নিয়ন্ত্রণে ত্রিপুরা সরকারের পদক্ষেপে ইন্টারনেট পরিষেবা বন্ধের পাশাপাশি ২৪ ঘণ্টা নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়। নিরাপত্তা বাহিনীর বড় সংখ্যক সদস্য কুমারঘাট ও পার্শ্ববর্তী এলাকায় মোতায়েন করা হয়, যাতে আরও হিংসা রোধ করা যায়। কেন্দ্রীয় বাহিনীর টহল দলও এলাকায় উপস্থিত থাকে এবং ফ্ল্যাগ মার্চের মাধ্যমে শৃঙ্খলা বজায় রাখে।
পুলিশ সূত্রে জানা যায়, চাঁদা সংগ্রহের বিবাদ এক পর্যায়ে সাম্প্রদায়িক সংঘাতে রূপ নেয় এবং তাৎক্ষণিকভাবে অগ্নিকাণ্ড ও ধ্বংস কাজের সঙ্গে যুক্ত হয়। ঘটনাস্থলে গৃহবন্দি ও ক্ষতিগ্রস্ত সম্পত্তির সংখ্যা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে পুলিশ দ্রুত পদক্ষেপ নিয়ে আটজন সন্দেহভাজনকে গ্রেফতার করে। গ্রেফতারকৃতদের বিরুদ্ধে হিংসা, অগ্নিকাণ্ড এবং সম্পত্তি ধ্বংসের অভিযোগে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।
অধিক তদন্তের জন্য স্থানীয় পুলিশ ও কেন্দ্রীয় বাহিনীর সমন্বয়ে একটি বিশেষ টাস্কফোর্স গঠন করা হয়েছে। তারা ঘটনাস্থল থেকে প্রমাণ সংগ্রহ, সাক্ষী বিবৃতি নথিভুক্ত এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের পটভূমি যাচাই করছে। বর্তমানে সকল প্রমাণ সংরক্ষণ করা হয়েছে এবং তদন্তের অগ্রগতি অনুযায়ী আদালতে ফৌজদারি মামলা দায়ের করা হবে।
পুলিশের মতে, সংঘর্ষের মূল সূত্র ছিল চাঁদা আদায়ের সময় এক গাড়ি থামিয়ে কাঠবোজাইয়ের জন্য চাঁদা দাবি করা, যা দুই সম্প্রদায়ের মধ্যে তীব্র বিরোধের সূচনা করে। এরপর শিমুলতলা এলাকায় এক সম্প্রদায়ের পরিবার চাঁদা দিতে অস্বীকার করলে অন্য সম্প্রদায়ের লোকজন গোষ্ঠী গঠন করে কাঠের দোকানসহ বিভিন্ন স্থাপনা জ্বালিয়ে দেয় এবং উপাসনালয় ভাঙচুর করে। এই ধারাবাহিকতা দ্রুতই পারস্পরিক হামলায় রূপ নেয়।
বৈধ মেলা, ভৈরব মেলা, যা ২৪ থেকে ২৬ জানুয়ারি অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা, তা রুদ্ধ করার জন্য নিরাপত্তা ব্যবস্থা বাড়ানো হয়েছে। মেলায় অংশগ্রহণকারী ও দর্শকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে অতিরিক্ত পুলিশ ও কেন্দ্রীয় বাহিনীর উপস্থিতি নিশ্চিত করা হয়েছে। মেলার আগে এই ধরনের হিংসা রোধে স্থানীয় প্রশাসন সতর্কতা জারি করেছে এবং জনগণকে শান্তিপূর্ণভাবে মেলায় অংশ নিতে আহ্বান জানিয়েছে।
আইনি দিক থেকে, গ্রেফতারকৃত আটজনের বিরুদ্ধে ফৌজদারি মামলা দায়ের করা হয়েছে এবং তাদের আদালতে হাজির হওয়ার তারিখ নির্ধারিত হয়েছে। তদন্ত চলাকালীন অতিরিক্ত সাক্ষী ও প্রমাণ সংগ্রহের জন্য বিশেষ দায়িত্বপ্রাপ্ত দল কাজ করছে। আদালতকে ঘটনাস্থল থেকে প্রাপ্ত সব প্রমাণের ভিত্তিতে যথাযথ শাস্তি দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হবে। শেষ পর্যন্ত, স্থানীয় প্রশাসন ও আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলি পুনরায় শান্তি ও শৃঙ্খলা বজায় রাখতে সকল প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে।



