দীর্ঘ সময়ের স্থবিরতার পর, বাংলাদেশের টেলিকম সেক্টর এখন অস্থায়ী সরকারের তত্ত্বাবধানে পুনরায় গতি পেয়েছে। গ্রামীণফোনের সিইও ইয়াসির আজমানের মতে, শিল্পে বহু পরিবর্তন ঘটছে, তবে কাঠামোগত সমস্যাগুলো এখনও বিনিয়োগ ও উদ্ভাবনের পথে বাধা সৃষ্টি করছে।
গত এক বছরে সরকার বহু দীর্ঘমেয়াদী সংস্কারকে এগিয়ে নিয়ে গেছে। প্রথমে একটি ব্যাপক টেলিকম লাইসেন্সিং নীতি প্রণয়ন করা হয়েছে, যা সেবা প্রদানকারীদের জন্য স্পষ্ট নিয়মাবলী নির্ধারণ করবে। একই সঙ্গে ৭০০ মেগাহার্জে স্পেকট্রাম নিলামের প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে, যা ভবিষ্যতে ৪জি ও ৫জি সেবার সম্প্রসারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
নতুন গুণগত সেবা নির্দেশিকা প্রকাশের মাধ্যমে নেটওয়ার্কের নির্ভরযোগ্যতা ও গ্রাহক সন্তুষ্টি বাড়ানোর লক্ষ্য নির্ধারিত হয়েছে। পাশাপাশি, আপডেটেড টেলিকম আইন পাসের ফলে আইনি কাঠামো আধুনিকায়িত হয়েছে, যা প্রযুক্তিগত অগ্রগতি ও আন্তর্জাতিক মানের সঙ্গে সামঞ্জস্য বজায় রাখবে।
এই নীতিগত পদক্ষেপগুলো বাজারে নতুন সুযোগের দরজা খুলে দিয়েছে, তবে একই সঙ্গে অপারেটরদের জন্য নতুন চ্যালেঞ্জও নিয়ে এসেছে। উদাহরণস্বরূপ, নেটওয়ার্ক‑লকড বা সিম‑লকড ডিভাইসের বিক্রয় অনুমোদন পেলে গ্রাহকদের পছন্দের ডিভাইস কেনার স্বাধীনতা বাড়বে, তবে বিক্রেতাদের জন্য স্টক ম্যানেজমেন্টে অতিরিক্ত দায়িত্ব আসবে।
সেবার প্যাকেজের সংখ্যা সীমা বাতিল করা হয়েছে, ফলে অপারেটররা বিভিন্ন মূল্য ও বৈশিষ্ট্যের প্যাকেজ তৈরি করে গ্রাহকের চাহিদা মেটাতে পারবে। ভয়েস ওভার ওয়াই‑ফাই সেবার অনুমোদন গ্রামাঞ্চলে নেটওয়ার্ক কভারেজ বাড়াবে, আর লিজড ডার্ক ফাইবারে প্রবেশাধিকার প্রদান অপারেটরদের ইনফ্রাস্ট্রাকচার খরচ কমিয়ে দেবে।
এদিকে, সিইও ট্যাক্সের বোঝা শিল্পের সবচেয়ে বড় বাধা হিসেবে উল্লেখ করেছেন। করের কাঠামোতে ৪০ শতাংশ কর্পোরেট ট্যাক্স, ১৫ শতাংশ ভ্যাট, ২০ শতাংশ সাপ্লিমেন্টারি ডিউটি, ১ শতাংশ সারচার্জ, ৫.৫ শতাংশ রেভিনিউ শেয়ার, ১ শতাংশ স্পেকট্রাম ওনারশিপ ফান্ডের অবদান এবং লাইসেন্স ও স্পেকট্রাম ফি অন্তর্ভুক্ত, যা মোট আয়ের উল্লেখযোগ্য অংশ গ্রাস করে।
এই আর্থিক চাপের ফলে দেশীয় ও বিদেশী উভয় বিনিয়োগকারীর আগ্রহ সীমিত হয়ে পড়েছে। আজমানের মতে, ট্যাক্স রিলিফ ছাড়া বিনিয়োগের আকাঙ্ক্ষা বাড়বে না, এবং এই সমস্যাটি শুধুমাত্র গ্রামীণফোনের নয়, সব টেলিকম অপারেটরের জন্য প্রযোজ্য।
ট্যাক্সের পাশাপাশি, অপারেটররা নিয়ন্ত্রক সংস্থার সঙ্গে দীর্ঘস্থায়ী বিরোধে জর্জরিত। ২৮ বছর ধরে গ্রামীণফোনের কোনো বার্ষিক অডিট বিরোধ সমাধান হয়নি, যা আইনি অনিশ্চয়তা বাড়িয়ে তুলেছে এবং ব্যবসায়িক পরিকল্পনাকে প্রভাবিত করছে।
সিইও এই সব বাধা সত্ত্বেও ভবিষ্যৎ সম্পর্কে আশাবাদী দৃষ্টিভঙ্গি পোষণ করেন। তিনি উল্লেখ করেন, বর্তমান সংস্কারগুলো দীর্ঘমেয়াদে শিল্পের উন্নয়নের ভিত্তি গড়ে তুলবে, তবে তা বাস্তবায়নের জন্য আর্থিক ও নিয়ন্ত্রক পরিবেশে স্বচ্ছতা ও ন্যায়সঙ্গত নীতি প্রয়োজন।
বিশ্লেষকরা ৭০০ মেগাহার্জ স্পেকট্রাম নিলামকে শিল্পের প্রতিযোগিতামূলক কাঠামো পরিবর্তনের মূল চালিকাশক্তি হিসেবে দেখছেন। তবে নিলামের সফলতা নির্ভর করবে ট্যাক্সের ভার হ্রাস, লাইসেন্স ফি হ্রাস এবং বিরোধ নিষ্পত্তির দ্রুততার ওপর।
সারসংক্ষেপে, বাংলাদেশে টেলিকম খাত এখন সংস্কারমূলক পদক্ষেপের মাধ্যমে আধুনিকায়নের পথে অগ্রসর হয়েছে। লাইসেন্সিং নীতি, গুণগত সেবা নির্দেশিকা, নতুন আইন এবং অবকাঠামো সহজলভ্যতা বাজারে ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে বলে আশা করা যায়। তবু উচ্চ করের চাপ এবং নিয়ন্ত্রক বিরোধের সমাধান না হলে বিনিয়োগের প্রবাহ সীমিত থাকবে, যা শিল্পের টেকসই বৃদ্ধি ও প্রযুক্তিগত উদ্ভাবনের পথে বাধা সৃষ্টি করবে।



