সৌদি আরবের জেদ্দায় ২২তম জরুরি অধিবেশনে ১১ জানুয়ারি, ওআইসি কাউন্সিল অব ফরেন মিনিস্টার্সে বাংলাদেশের পররাষ্ট্র উপদেষ্টা তৌহিদ হোসেন ইসরায়েলের সাম্প্রতিক সোমালিল্যান্ড স্বীকৃতি পর সোমালিয়ার সার্বভৌমত্বের পক্ষে দৃঢ় সমর্থন জানালেন।
এই জরুরি সভা ইসরায়েল কর্তৃক স্বীকৃত বিচ্ছিন্ন অঞ্চল ‘সোমালিল্যান্ড’‑এর ফলে সোমালি ফেডারেল প্রজাতন্ত্রের ভূখণ্ডিক অখণ্ডতা, ঐক্য ও আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার ওপর সম্ভাব্য প্রভাব আলোচনা করার জন্য আহ্বান জানানো হয়।
সোমালিল্যান্ড ১৯৯১ সালে সোমালিয়ার কেন্দ্রীয় সরকার থেকে আলাদা হয়ে স্বাধীনতা ঘোষণা করলেও, জাতিসংঘের কোনো সদস্য রাষ্ট্রের কাছ থেকে এখনো স্বীকৃতি পায়নি। ঐ অঞ্চলটি পূর্বে ব্রিটিশ শাসিত উত্তর সোমালিয়ার উত্তর‑পশ্চিম কোণে অবস্থিত।
গত শুক্রবার ইসরায়েল সরকার আনুষ্ঠানিকভাবে সোমালিল্যান্ডকে স্বীকৃতি প্রদান করার কথা জানায়। ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু পূর্ণাঙ্গ কূটনৈতিক সম্পর্ক স্থাপনের লক্ষ্যে সোমালিল্যান্ডের সঙ্গে একটি যৌথ ঘোষণাপত্র স্বাক্ষরিত হয়েছে বলে উল্লেখ করেন। তিনি এ ঘোষণাপত্রকে ‘আব্রাহাম চুক্তি’র চেতনা অনুযায়ী সই করা হয়েছে বলে উল্লেখ করে, যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় আরব দেশগুলোর সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে তোলার ঐ ঐতিহাসিক চুক্তির কথা স্মরণ করিয়ে দেন।
ইসরায়েলের এই ঘোষণার কয়েক ঘণ্টার মধ্যে সোমালি ফেডারেল সরকার একটি তীব্র নিন্দা জানায়। সরকারী বিবৃতিতে ইসরায়েলের পদক্ষেপকে সোমালিয়ার সার্বভৌমত্বের ওপর আক্রমণ এবং আন্তর্জাতিক আইনের বিরোধী একটি অবৈধ কাজ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়।
বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের প্রকাশ্য বিজ্ঞপ্তিতে তৌহিদ হোসেনের বক্তব্য তুলে ধরা হয়। তিনি আন্তর্জাতিক আইন রক্ষার, সদস্য রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ব ও ভৌগোলিক অখণ্ডতার প্রতি সম্মান বজায় রাখার এবং মুসলিম বিশ্বের ঐক্য ও সংহতি রক্ষার ক্ষেত্রে ওআইসি (ওইসিস) এর সম্মিলিত অঙ্গীকারের সঙ্গে বাংলাদেশ সম্পূর্ণভাবে একাত্ম, তা জোর দিয়ে বলেন।
হোসেন ওআইসিকে স্পষ্টভাবে ইসরায়েলের সোমালিল্যান্ড স্বীকৃতি প্রত্যাখ্যানের আহ্বান জানিয়ে, কোনো ধরনের ‘অবৈধ আলোচনা’ সহ্য করা হবে না, একতরফা জবরদস্তি নয়, বরং ন্যায়বিচার, আন্তর্জাতিক আইন ও বহুপাক্ষিকতার বিজয় হবে, এমন বার্তা দেন। তিনি জোর দিয়ে বলেন, ওআইসি সদস্য রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ব কোনোভাবে আপসযোগ্য নয়।
ওআইসি সদস্য দেশগুলোও এই অধিবেশনে একসাথে সমর্থন প্রকাশ করে যে, আন্তর্জাতিক আইনের নীতি ও সদস্য রাষ্ট্রের ভূখণ্ডিক অখণ্ডতা রক্ষা করা হবে, এবং কোনো স্বীকৃতি বা স্বতন্ত্রতা স্বীকৃতির প্রচেষ্টা অবৈধ বলে গণ্য হবে।
ইসরায়েলের এই স্বীকৃতি অঞ্চলীয় রাজনৈতিক গতিবিধিতে নতুন মাত্রা যোগ করতে পারে। আরব দেশগুলোর সঙ্গে সম্পর্ক শক্তিশালী করার লক্ষ্যে ইসরায়েল যে ‘আব্রাহাম চুক্তি’র কাঠামো ব্যবহার করছে, তা ওআইসি সদস্যদের মধ্যে মতবিরোধের সম্ভাবনা বাড়িয়ে তুলতে পারে। তৌহিদ হোসেনের স্পষ্ট অবস্থান বাংলাদেশের মুসলিম বিশ্বের সঙ্গে ঐক্য রক্ষার নীতি ও আন্তর্জাতিক আইনের প্রতি অটল প্রতিশ্রুতি পুনরায় নিশ্চিত করে।
অধিকন্তু, ওআইসি আগামীতে সমষ্টিগতভাবে ইসরায়েলের এই পদক্ষেপের বিরুদ্ধে কূটনৈতিক প্রতিবাদ গঠন, জাতিসংঘে বিষয়টি উত্থাপন এবং প্রয়োজনীয় আন্তর্জাতিক সমর্থন সংগ্রহের সম্ভাবনা প্রকাশ করেছে। এসব পদক্ষেপের মাধ্যমে সোমালিয়ার সার্বভৌমত্ব রক্ষার পাশাপাশি অঞ্চলের শান্তি ও স্থিতিশীলতা বজায় রাখার লক্ষ্য রয়েছে।
সারসংক্ষেপে, তৌহিদ হোসেনের মন্তব্য ও বাংলাদেশ সরকারের প্রকাশিত অবস্থান আন্তর্জাতিক আইনের শাসন, সদস্য রাষ্ট্রের ভূখণ্ডিক অখণ্ডতা এবং মুসলিম বিশ্বের সংহতি রক্ষার প্রতি দেশের অটল প্রতিশ্রুতি তুলে ধরে। একই সঙ্গে ইসরায়েলের সোমালিল্যান্ড স্বীকৃতি আন্তর্জাতিক মঞ্চে বিতর্কের নতুন অধ্যায় খুলে দিয়েছে, যা ভবিষ্যতে কূটনৈতিক ও রাজনৈতিক স্তরে গভীর প্রভাব ফেলতে পারে।



