বাংলাদেশ ব্যাংকের সাম্প্রতিক নির্দেশনা অনুযায়ী, দেশের বেশ কয়েকটি ব্যাংক এখন সর্বোচ্চ চার কোটি টাকা পর্যন্ত আবাসন ঋণ প্রদান করতে সক্ষম। এই নীতি ঋণ‑দানের সীমা বাড়িয়ে গৃহস্বপ্ন পূরণে সহায়তা করার লক্ষ্য রাখে।
নিয়ম অনুযায়ী, আবাসন খাতে ঋণ ও মূলধনের অনুপাত ৭০:৩০ নির্ধারিত হয়েছে। অর্থাৎ, এক কোটি টাকার ফ্ল্যাটের জন্য ব্যাংক সর্বোচ্চ সত্তর লাখ টাকা পর্যন্ত অর্থায়ন করতে পারবে, বাকি ত্রিশ লাখ টাকা গ্রাহক নিজে প্রদান করতে হবে। তবে আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো সম্পূর্ণ ঋণও দিতে পারে, যদি গ্রাহকের ক্রেডিটযোগ্যতা অনুমোদিত হয়।
ঋণগ্রহীতার বয়সের সীমা স্পষ্ট করা হয়েছে; আবেদনকারী কমপক্ষে বাইশ বছর বয়সী হতে হবে এবং ঋণ পরিশোধের শেষ পর্যন্ত পঁয়ষট্টি বছরের বেশি বয়সী হতে পারবে না। বেতনভিত্তিক কর্মচারীর মাসিক ন্যূনতম আয় পঁচিশ হাজার টাকা নির্ধারিত, আর ব্যবসায়ী ও বাড়িওয়ালারাও এই ঋণ প্যাকেজের আওতায় আসবে।
আবাসন ঋণ পেতে প্রয়োজনীয় নথিপত্রের তালিকা বেশ বিস্তৃত। প্রথমে ফ্ল্যাট বা জমি ক্রয়ের রেজিস্ট্রিকৃত চুক্তিপত্রের সত্যায়িত ফটোকপি, অনুমোদিত নকশা ও অনুমোদনপত্রের কপি, রেজিস্ট্রিকৃত বায়না চুক্তিপত্রের মূল কপি ও বরাদ্দপত্র, নির্মাণের জন্য অনুমোদিত নকশা, মূল দলিল, নামজারি খতিয়ান, খাজনা রসিদের সত্যায়িত কপি, সিএস, এসএ, আরএস, বিএস খতিয়ানের কপি, বারো বছরের তল্লাশিসহ নির্দায় সনদ (এনইসি) এবং সরকারী বরাদ্দকৃত জমির ক্ষেত্রে মূল বরাদ্দপত্র ও দখল হস্তান্তরপত্র অন্তর্ভুক্ত।
মর্টগেজ বা বন্ধকি ঋণের ক্ষেত্রে স্থায়ী সম্পদকে জামানত হিসেবে রাখতে হয়; সাধারণত জমির দলিলকে প্রধান জামানত হিসেবে ব্যবহার করা হয়। ঋণের মেয়াদ পাঁচ থেকে বিশ বছর বা তার বেশি হতে পারে, যা গ্রাহকের আর্থিক সক্ষমতা ও প্রকল্পের সময়সীমার ওপর নির্ভর করে। ঋণ অনুমোদনের জন্য করের সনদ, গ্যাস‑বিদ্যুৎ বিল, ব্যাংক স্টেটমেন্ট, জাতীয় পরিচয়পত্র, জামিনদারের নথি এবং বেতনের সনদ ইত্যাদি অতিরিক্ত ডকুমেন্ট জমা দিতে হয়।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ছয়টি ব্যাংক চার কোটি টাকা পর্যন্ত ঋণ দিতে পারবে। এদের মধ্যে সিটিজেনস ব্যাংক, ইস্টার্ন ব্যাংক, বেঙ্গল কমার্শিয়াল ব্যাংক, ব্র্যাক ব্যাংক, প্রাইম ব্যাংক এবং সিটি ব্যাংক অন্তর্ভুক্ত। অন্যদিকে, এগারোটি ব্যাংক তিন কোটি টাকা পর্যন্ত ঋণ প্রদান করতে সক্ষম। এই তালিকায় মিডল্যান্ড ব্যাংক, পূবালী ব্যাংক, মেঘনা ব্যাংক, মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংক, কমিউনিটি ব্যাংক, শাহজালাল ইসলামী ব্যাংক এবং এনসিসি ব্যাংক উল্লেখযোগ্য।
এই নীতির বাস্তবায়ন গৃহঋণ বাজারে নতুন গতিবেগ আনবে বলে আশা করা হচ্ছে। ঋণ সীমা বাড়ার ফলে উচ্চ মূল্যের ফ্ল্যাট ও বাড়ি কেনার জন্য প্রয়োজনীয় তহবিল সহজলভ্য হবে, বিশেষত প্রথমবারের বাড়ি ক্রেতা ও তরুণ পেশাজীবীদের জন্য। তবে ঋণগ্রহীতাদের জন্য বয়স ও আয় সীমা, পাশাপাশি সম্পূর্ণ নথিপত্র প্রস্তুত করা গুরুত্বপূর্ণ, যাতে ঋণ অনুমোদনের প্রক্রিয়া দ্রুত এবং স্বচ্ছ হয়।
দীর্ঘমেয়াদে এই নীতি ব্যাংকের ঋণ পোর্টফোলিওকে বৈচিত্র্যপূর্ণ করবে এবং গৃহঋণ ডিফল্টের ঝুঁকি কমাতে সহায়তা করবে বলে বিশ্লেষকরা অনুমান করছেন। তদুপরি, আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো সম্পূর্ণ ঋণ প্রদান করার সুযোগ পেলে বাজারে প্রতিযোগিতা বাড়বে, যা সুদের হার ও শর্তাবলীতে স্বাভাবিকভাবে হ্রাস ঘটাতে পারে।
সারসংক্ষেপে, বাংলাদেশ ব্যাংকের নতুন নির্দেশনা গৃহঋণ বাজারে প্রবেশের বাধা কমিয়ে, অধিক সংখ্যক মানুষকে স্বপ্নের বাড়ি অর্জনের পথে সহায়তা করবে। তবে ঋণগ্রহীতাদের উচিত তাদের আর্থিক সক্ষমতা, ঋণের শর্তাবলী এবং প্রয়োজনীয় নথিপত্রের পূর্ণতা নিশ্চিত করা, যাতে ভবিষ্যতে কোনো আর্থিক চাপের মুখে না পড়তে হয়।



