৪৩ বছর বয়সী প্রাক্তন পপ তারকা ববি ওয়াইন (আসল নাম রবার্ট কিয়াগুলান্যি সসেনতামু) ১৫ জানুয়ারি অনুষ্ঠিত উগান্ডার প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে আবারও প্রেসিডেন্ট ইয়োয়েরি মুসেভেনির (৮১) মুখোমুখি হবেন। দশ বছর আগে সঙ্গীত থেকে রাজনীতিতে পা রাখার পর থেকে তিনি দেশের যুবসমাজের মধ্যে বিশাল সমর্থন অর্জন করেছেন এবং নিজেকে “গেটো প্রেসিডেন্ট” বলে পরিচিত করেন। তার নির্বাচনী প্রচার কর্মসূচিতে বেকারত্ব, মানবাধিকার এবং তরুণদের ভবিষ্যৎ নিরাপত্তা প্রধান বিষয় হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে।
ববি ওয়াইন ক্যাম্পালার গরিব পাড়া থেকে উঠে এসে সঙ্গীতের মাধ্যমে জাতীয় পর্যায়ে পরিচিতি পেয়েছিলেন। তার গানের ভক্তবৃন্দের বেশিরভাগই দেশের তরুণ জনগোষ্ঠী, যারা মোট জনসংখ্যার বড় অংশ গঠন করে। এই সামাজিক পটভূমি তার রাজনৈতিক বার্তাকে “জনগণের কণ্ঠস্বর” হিসেবে উপস্থাপন করতে সহায়তা করে।
প্রায় এক দশক আগে তিনি সঙ্গীত ক্যারিয়ার ত্যাগ করে ন্যাশনাল ইউনিটি প্ল্যাটফর্ম (এনইউপি) গঠন করেন এবং দ্রুতই দেশের প্রধান বিরোধী শক্তি হিসেবে উদয় হন। তার রাজনৈতিক যাত্রা শুরু হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে মুসেভেনির শাসনব্যবস্থার প্রতি কঠোর সমালোচনা এবং সংস্কার দাবি করা হয়।
রাজনীতিতে প্রবেশের পর থেকে ববি ওয়াইন একাধিকবার গ্রেফতার হয়েছেন। প্রথমে তিনি অবৈধ অস্ত্রের দখল সংক্রান্ত অভিযোগে আটক হন, যা ব্যাপকভাবে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপূর্ণ বলে বিবেচিত হয়। পরবর্তীতে তাকে দেশদ্রোহের অভিযোগেও গ্রেফতার করা হয়, তবে উভয় মামলাই শেষ পর্যন্ত বাদ দেওয়া হয়।
২০১৮ সালে আন্তর্জাতিক সঙ্গীত জগতের কিছু বিশিষ্ট নাম, যেমন ক্রিস মার্টিন এবং ড্যামন আলবার্ন, ববি ওয়াইনের মুক্তির জন্য একটি পিটিশন স্বাক্ষর করেন। এই পিটিশন বিশ্বব্যাপী মানবাধিকার সংস্থার দৃষ্টি আকর্ষণ করে এবং তার রাজনৈতিক অবস্থানকে আন্তর্জাতিক মঞ্চে তুলে ধরে।
২০২১ সালের নির্বাচনী প্রচারকালে ববি ওয়াইনের সমাবেশে পুলিশ গুলি চালায়, যার ফলে তার সমর্থকদের মধ্যে বিশাল ক্ষোভ সৃষ্টি হয়। এই ঘটনা তার ওপর আরোপিত হিংসা ও দমনমূলক নীতির উদাহরণ হিসেবে উল্লেখ করা হয় এবং তার সমর্থকদের মধ্যে আরও দৃঢ়তা জাগিয়ে তোলে।
ববি ওয়াইন নিজে প্রকাশ্যে বলেন যে তিনি সাধারণ জনগণের সঙ্গে সবচেয়ে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক বজায় রাখেন এবং আটজন প্রার্থীর মধ্যে তিনি সবচেয়ে বেশি হুমকি, হয়রানি এবং ভয় পেয়েছেন। তার এই বক্তব্য তার সমর্থকদের মধ্যে আত্মবিশ্বাস বাড়ায় এবং নির্বাচনী প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা সম্পর্কে প্রশ্ন তোলার সুযোগ করে দেয়।
অধিকারের পক্ষ থেকে ধারাবাহিকভাবে বলা হচ্ছে যে ববি ওয়াইন, তার সমর্থক এবং এনইউপি দলের সদস্যদের গ্রেফতার রাজনৈতিক উদ্দেশ্য নয়, বরং আইন শৃঙ্খলা রক্ষার জন্য প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ। মুসেভেনি সরকার ববি ওয়াইনকে নগর এলাকায় সহিংস সমাবেশের দায়ী করে অভিযোগ তুলেছে এবং তার কার্যক্রমকে নিরাপত্তা হুমকি হিসেবে উপস্থাপন করেছে।
বিশ্লেষকরা উল্লেখ করেন যে ববি ওয়াইনের জনপ্রিয়তা, বিশেষত যুবকদের মধ্যে, তার জন্য একটি শক্তিশালী ভোটার ভিত্তি তৈরি করেছে, তবে মুসেভেনির দীর্ঘমেয়াদী শাসন, নিরাপত্তা বাহিনীর সমর্থন এবং নির্বাচনী ব্যবস্থার কাঠামো তাকে উল্লেখযোগ্য সুবিধা প্রদান করে। তাই নির্বাচনের ফলাফল অনিশ্চিত হলেও ববি ওয়াইনকে বড় চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হতে হবে।
এই নির্বাচনের ফলাফল উগান্ডার গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার ভবিষ্যৎ নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। যদি ববি ওয়াইন উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জন করেন, তবে দেশের রাজনৈতিক সংস্কার এবং মানবাধিকার উন্নয়নের জন্য নতুন দিকনির্দেশনা তৈরি হতে পারে। অন্যদিকে, যদি মুসেভেনি পুনর্চয়ন করেন, তবে বিরোধী গোষ্ঠীর ওপর দমনমূলক নীতি অব্যাহত থাকতে পারে এবং আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সঙ্গে সম্পর্কেও প্রভাব পড়তে পারে।
উগান্ডার রাজনৈতিক দৃশ্যপটে ববি ওয়াইনের পুনরায় প্রতিদ্বন্দ্বিতা দেশের যুবসমাজের উচ্চ প্রত্যাশা এবং বিদ্যমান শাসনব্যবস্থার মধ্যে তীব্র সংঘর্ষের ইঙ্গিত দেয়। নির্বাচনের পরবর্তী ধাপগুলোতে আইনগত চ্যালেঞ্জ, ভোটার শিক্ষা এবং নিরাপত্তা ব্যবস্থার কার্যকারিতা প্রধান বিষয় হয়ে উঠবে, যা দেশের স্থিতিশীলতা ও গণতান্ত্রিক অগ্রগতির জন্য গুরুত্বপূর্ণ হবে।



