যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প গ্রিনল্যান্ডের মালিকানা নিয়ে নতুন দাবি তুলে ধরার পর, দ্বীপের বাসিন্দারা নিরাপত্তা ও স্বায়ত্তশাসন সম্পর্কে গভীর অনিশ্চয়তা প্রকাশ করছেন। ডেনমার্কের অংশ হিসেবে স্বায়ত্তশাসিত গ্রিনল্যান্ডে ট্রাম্পের প্রস্তাবের ওপর হোয়াইট হাউস সক্রিয় আলোচনায় লিপ্ত, এবং আগামী সপ্তাহে মার্কিন পররাষ্ট্র মন্ত্রী মার্কো রুবিও ডেনমার্ক ও গ্রিনল্যান্ডের প্রতিনিধিদের সঙ্গে দ্বীপের ভবিষ্যৎ নিয়ে আলোচনা করবেন।
গ্রিনল্যান্ড, যদিও জনসংখ্যা মাত্র প্রায় ৫৭ হাজার, তবে তার আকার যুক্তরাজ্যের চেয়ে নয় গুণ বড় এবং উত্তর আটলান্টিকের কৌশলগত অবস্থানে অবস্থিত। বরফে ঢাকা এই ভূখণ্ডে তামা, ইউরেনিয়াম, বিরল ধাতু সহ বিভিন্ন খনিজ সম্পদ সমৃদ্ধ, যা আন্তর্জাতিক শক্তি গোষ্ঠীর দৃষ্টি আকর্ষণ করে।
ট্রাম্পের মতে, যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় নিরাপত্তা রক্ষার জন্য গ্রিনল্যান্ডকে যুক্তরাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণে রাখা প্রয়োজন। তিনি পূর্বে দ্বীপটি জোরপূর্বক দখল করার সম্ভাবনাও বাদ দেননি, যদিও এ বিষয়ে কোনো আনুষ্ঠানিক পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি। এই অবস্থানকে কেন্দ্র করে যুক্তরাষ্ট্র ও ডেনমার্কের মধ্যে কূটনৈতিক আলোচনার তীব্রতা বাড়ছে।
ভেনেজুয়েলায় সাম্প্রতিক সময়ে ট্রাম্পের সামরিক হস্তক্ষেপের পরিণতি দেখার ফলে গ্রিনল্যান্ডের মানুষদের মধ্যে আতঙ্ক বাড়ছে। ভেনেজুয়েলায় প্রেসিডেন্টকে গ্রেপ্তার করে বিচারের মুখে আনা ঘটনাকে উদাহরণ হিসেবে নিয়ে, দ্বীপের বাসিন্দারা নিজেদের নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন এবং ট্রাম্পের সম্ভাব্য সামরিক পদক্ষেপের ভয় প্রকাশ করছেন।
গ্রিনল্যান্ডের জনসংখ্যা কম হলেও, তার ভূ-রাজনৈতিক গুরুত্ব অস্বীকার করা যায় না। দ্বীপের সমৃদ্ধ খনিজ সম্পদ এবং আর্টিক অঞ্চলে তার অবস্থান আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও সামরিক কৌশলের জন্য গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। এই প্রেক্ষাপটে ট্রাম্পের প্রস্তাবকে কেবল অর্থনৈতিক নয়, কৌশলগত দৃষ্টিকোণ থেকেও বিশ্লেষণ করা হচ্ছে।
স্থানীয়দের মতে, তারা শান্তিপূর্ণ জীবনযাপন করতে চায় এবং কোনো বিদেশি শক্তির আধিপত্যে বসতে চায় না। অধিকাংশ গ্রিনল্যান্ডবাসী যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিকত্ব গ্রহণে অনিচ্ছুক এবং নিজেদের স্বায়ত্তশাসন বজায় রাখতে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ। এই মনোভাবকে তুলে ধরতে এক নারী, নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক, বলেন, “ভেনেজুয়েলায় সামরিক হস্তক্ষেপ দেখার পর আমি এখন ট্রাম্পের গ্রিনল্যান্ড দখলের হুমকিতে মৃত্যুভয়ে আছি।”
একজন ২০ বছর বয়সী তরুণও একই রকম উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন, “আমরা সবাই মার্কিন প্রেসিডেন্টকে নিয়ে ভীষণ ক্লান্ত। আমরা সবসময় এখানে খুব শান্তিতে বাস করেছি, আমরা কেবল নিজেদের মতো করে থাকতে চাই।” তার কথায় স্পষ্ট যে, দীর্ঘদিনের শান্তিপূর্ণ জীবনধারা এখন অনিশ্চয়তার মুখে।
নুউক শহরের বাসিন্দা পিৎসি কারোলুসেনও বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তিনি বলেন, “গত কয়েকটি দিন খুবই কঠিন গেছে, খুবই বিচলিত অবস্থার মধ্য দিয়ে কেটেছে।” তার পাশাপাশি আরও অনেক গ্রিনল্যান্ডবাসী দ্বীপের ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তা অনুভব করছেন এবং পরিস্থিতি স্থিতিশীল না হওয়া পর্যন্ত উদ্বেগের স্রোত অব্যাহত থাকবে।
একজন স্থানীয় নারী আরও যোগ করেন, “আমার মনে অনেককিছু নিয়ে চিন্তা চলছে। অন্যদিকে, আমি শান্ত থাকারও চেষ্টা করছি। কারণ, আমরা জানি না কি হতে চলেছে।” এই ধরনের ব্যক্তিগত অনুভূতি দেখায় যে, কূটনৈতিক আলোচনার ফলাফল যাই হোক না কেন, গ্রিনল্যান্ডের সাধারণ মানুষ এখনো অনিশ্চয়তার মধ্যে বেঁচে আছে।
হোয়াইট হাউসের আলোচনার পরবর্তী ধাপ এখনো স্পষ্ট নয়, তবে মার্কো রুবিওর ডেনমার্ক ও গ্রিনল্যান্ডের কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠকটি গুরুত্বপূর্ণ সূচক হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের দৃষ্টিতে এই আলোচনায় কূটনৈতিক সমঝোতা, অর্থনৈতিক শর্ত এবং নিরাপত্তা গ্যারান্টি অন্তর্ভুক্ত হতে পারে।
গ্রিনল্যান্ডের ভবিষ্যৎ নির্ধারণে ডেনমার্কের ভূ-রাজনৈতিক অবস্থান, যুক্তরাষ্ট্রের কৌশলগত স্বার্থ এবং স্থানীয় জনগণের স্বায়ত্তশাসন চাহিদা একসঙ্গে বিবেচনা করা হবে। শেষ পর্যন্ত, দ্বীপের বাসিন্দারা আশা করছেন যে, কোনো সিদ্ধান্তই তাদের শান্তিপূর্ণ জীবনযাপনকে ক্ষুণ্ন না করে, এবং আন্তর্জাতিক মঞ্চে তাদের স্বতন্ত্র পরিচয় রক্ষা পাবে।



