ইরানের রাজধানী তেহরানে চলমান বিরোধী-সরকারি প্রতিবাদে আহত ও মৃতের সংখ্যা বাড়ার ফলে তিনটি প্রধান হাসপাতালই রোগী ভর্তি ও দেহসংরক্ষণের ক্ষেত্রে সম্পূর্ণ অক্ষম অবস্থায় পৌঁছেছে। এই পরিস্থিতি দুই সপ্তাহ আগে তেহরানে আর্থিক সংকটের প্রতিবাদে শুরু হওয়া আন্দোলনের ধারাবাহিকতা, যা এখন দেশের সব প্রদেশে ১০০টিরও বেশি শহর ও গ্রামে ছড়িয়ে পড়েছে। রোগীর সংখ্যা ও আহতদের তীব্রতা বাড়ার পেছনে নিরাপত্তা বাহিনীর গুলিবিদ্ধের সংখ্যা এবং গুলিবিদ্ধের ধরণ উভয়ই ভূমিকা রাখছে।
হাসপাতাল কর্মীরা জানান, তেহরানের এক চোখের বিশেষায়িত হাসপাতালসহ অন্যান্য দুইটি চিকিৎসা কেন্দ্রে রোগীর প্রবাহ এতটাই তীব্র যে জরুরি বিভাগে রোগীর সংখ্যা নিয়ন্ত্রণের কোনো সুযোগই নেই। গুলিবিদ্ধের ক্ষেত্রে সরাসরি গুলি ও রাবার বুলেট উভয়ই ব্যবহৃত হচ্ছে, ফলে শারীরিক ক্ষতি গুরত্বপূর্ণভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে।
চিকিৎসকরা উল্লেখ করেন, গুলিবিদ্ধের বেশিরভাগ শিকার তরুণ বয়সের, যাদের মাথা ও হৃদয়সহ গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গগুলোতে সরাসরি গুলি লেগেছে। এমন আঘাতের ফলে রোগীরা জরুরি কক্ষের দরজা পার হওয়ার মুহূর্তেই প্রাণ হারিয়ে ফেলছে, ফলে সি.পি.আর. করার সময়ও খুব কমই থাকে।
একজন হাসপাতাল কর্মীর মতে, রোগীর সংখ্যা এতটাই বেশি যে সি.পি.আর. করার জন্য পর্যাপ্ত সময় ও মানবসম্পদ নেই। রোগীরা জরুরি শয্যায় বসে পৌঁছানোর সঙ্গে সঙ্গেই শ্বাসরুদ্ধ হয়ে যায়, ফলে চিকিৎসা কর্মীদের জন্য দ্রুত কাজ করা কঠিন হয়ে পড়ে।
প্রাথমিক তথ্য অনুযায়ী, প্রায় ৩৮ জন রোগী তৎক্ষণাৎ মৃত্যুবরণ করেছে, তাদের বেশিরভাগই হাসপাতালে পৌঁছানোর আগেই গুলিবিদ্ধের ফলে প্রাণ হারিয়েছে। গুলিবিদ্ধের গতি ও তীব্রতা এমন যে, কিছু শিকার হাসপাতালে পৌঁছানোর আগে থেকেই মৃত অবস্থায় পাওয়া যায়।
মর্গেজের ক্ষমতা দ্রুত পূর্ণ হয়ে যাওয়ায় দেহসংরক্ষণের ব্যবস্থা সংকটময় হয়ে পড়েছে। কর্মীরা জানিয়েছেন, দেহগুলোকে একে অপরের ওপর স্তূপ করে সংরক্ষণ করা হচ্ছে, এবং মর্গেজ পূর্ণ হলে প্রার্থনা ঘরে দেহগুলোকে স্তূপবদ্ধ করে রাখা হচ্ছে।
শিকারের বয়স গড়ে ২০ থেকে ২৫ বছরের মধ্যে, যা তরুণ প্রজন্মের বৃহৎ অংশকে অন্তর্ভুক্ত করে। এই তরুণদের মৃত্যু ও আঘাতের পরিমাণ সমাজে গভীর শোকের ছাপ ফেলেছে।
প্রতিবাদটি তেহরানে আর্থিক সমস্যার প্রতিবাদ হিসেবে শুরু হলেও, দ্রুতই রাজনৈতিক ও সামাজিক চাহিদা হিসেবে রূপান্তরিত হয়েছে এবং দেশের বিভিন্ন কোণে ছড়িয়ে পড়েছে। মানবাধিকার সংস্থা অনুযায়ী, এখন পর্যন্ত শতাধিক মানুষ গ্রেফতার হয়েছে এবং বহু মানুষ নিহত হয়েছে। নিরাপত্তা বাহিনীর ২১ জন কর্মীরও মৃত্যু ঘটেছে বলে জানানো হয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের সরকার গত শুক্রবার পুনরায় উল্লেখ করেছে যে, প্রতিবাদকারীদের হত্যা করা হলে তা সামরিক প্রতিক্রিয়ার মুখে পড়বে। ইরানের সরকার এই মন্তব্যকে প্রতিবাদকে ‘হিংসাত্মক বিদ্রোহী কাজ’ ও ‘বিস্তৃত ধ্বংসকর্মে’ রূপান্তর করার দায় যুক্তরাষ্ট্রের ওপর আরোপ করেছে।
ইরানে আন্তর্জাতিক সংবাদ সংস্থাগুলোর প্রতিবেদন সীমিত, এবং দেশের ইন্টারনেট সংযোগ বৃহস্পতিবার সন্ধ্যা থেকে প্রায় সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে যাওয়ায় তথ্য সংগ্রহ ও যাচাই করা কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছে। ফলে বর্তমান পরিস্থিতি সম্পর্কে সঠিক ও পূর্ণাঙ্গ তথ্য পাওয়া চ্যালেঞ্জিং।
এই মানবিক সংকটের রাজনৈতিক প্রভাব স্পষ্ট, কারণ সরকারকে এখনো নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক নীতি পুনর্বিবেচনা করতে হবে, অন্যথায় দেশের অভ্যন্তরীণ অস্থিরতা বাড়তে পারে। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের চাপ ও মানবাধিকার সংস্থার পর্যবেক্ষণ ভবিষ্যতে কী ধরনের পদক্ষেপ নেওয়া হবে তা নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।



