২০১২ সালের ৮ জানুয়ারি, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের তৃতীয় বর্ষের ছাত্র জুবায়ের আহমেদকে ছাত্রলীগের সদস্যরা আক্রমণ করে। আক্রমণের পরপরই তিনি রাজধানীর ইউনাইটেড হাসপাতালে ভর্তি হন এবং পরের দিনই মৃত্যুবরণ করেন। জুবায়েরের মৃত্যু দেশের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে রাজনৈতিক হিংসার এক ভয়াবহ উদাহরণ হিসেবে রেকর্ডে যুক্ত হয়।
হত্যার পরপরই জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের রেজিস্ট্রার হামিদুর রহমান মামলাটি সাভারের আশুলিয়া থানায় দায়ের করেন। একই বছরে ৮ এপ্রিল, আশুলিয়া থানার তদন্ত কর্মকর্তা মীর শাহীন শাহ পারভেজের তত্ত্বাবধানে ১৩ জন ছাত্রের বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র দাখিল করা হয়।
অভিযুক্তদের মধ্যে ছিলেন পরিসংখ্যান বিভাগের শফিউল আলম সেতু ও অভিনন্দন কুণ্ডু, প্রাণীবিজ্ঞান বিভাগের আশিকুল ইসলাম আশিক, খান মোহাম্মদ রিয়াজ ও জাহিদ হাসান, দর্শন বিভাগের কামরুজ্জামান সোহাগ, ইশতিয়াক মেহবুব অরূপ ও রাশেদুল ইসলাম রাজু, সরকার ও রাজনীতি বিভাগের মাহবুব আকরাম, ইতিহাস বিভাগের মাহমুদুল হাসান ও মাজহারুল ইসলাম, অণুজীব বিজ্ঞান বিভাগের নাজমুস সাকিব তপু এবং লোকপ্রশাসন বিভাগের নাজমুল হাসান প্লাবন।
বিচার প্রক্রিয়া দীর্ঘায়িত হওয়ার পর, ২০১৬ সালের ৮ ফেব্রুয়ারি সর্বোচ্চ আদালত রায় দেয়। রাশেদুল ইসলাম রাজু, আশিক, সোহাগ, জাহিদ এবং মাহবুব আকরামকে মৃত্যুদণ্ডের সাজা দেওয়া হয়। ইশতিয়াক মেহবুব ও নাজমুস সাকিবকে আজীবন কারাদণ্ড আর বাকি ছয়জনকে খালাস প্রদান করা হয়।
সেই সময়ে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য ছিলেন রসায়ন বিভাগের অধ্যাপক শরীফ এনামুল কবির। হত্যাকাণ্ডের পরের আন্দোলনের মুখে তিনি পদত্যাগ করেন, তবে একই বছর ২৫ জুলাই সরকার তাকে পাবলিক সার্ভিস কমিশনের (পিএসসি) সদস্য হিসেবে নিয়োগ দেয়।
জুবায়েরের বড় ভাই, আব্দুল্লাহ আল মামুন, সিলেটের লিডিং ইউনিভার্সিটিতে আইন বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক। তিনি কাগজে-কলমে বিচারের অগ্রগতি না দেখায় গভীর হতাশা প্রকাশ করেন এবং রায়ের বাস্তবায়ন ও শাস্তি কার্যকর করার দাবি তীব্রভাবে তুলে ধরেন। মামুনের মতে, পুলিশ ও রাষ্ট্রব্যবস্থা যদি ইচ্ছা করে তবে দণ্ডপ্রাপ্তদের গ্রেফতার করে শাস্তি কার্যকর করা সম্ভব।
১৪ বছর পার হওয়া সত্ত্বেও, মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত পাঁচজন অভিযুক্ত এখনও গ্রেফতার হয়নি। আইনগত রায়ের কার্যকরী হওয়া না পর্যন্ত পরিবার ও সমাজের মধ্যে ন্যায়বিচারের প্রতি অসন্তোষ রয়ে গেছে। সংশ্লিষ্ট আইন প্রয়োগকারী সংস্থার পক্ষ থেকে কোনো নতুন গ্রেফতার বা বিচারের আপডেট প্রকাশিত হয়নি।
বিচারিক প্রক্রিয়ার দীর্ঘায়িত হওয়া এবং দণ্ডপ্রাপ্তদের অব্যাহত অব্যাহতি দেশের আইনি ব্যবস্থার কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে। জুবায়েরের পরিবার এখনো রায়ের বাস্তবায়ন ও শাস্তি কার্যকর হওয়ার জন্য প্রত্যাশা করছেন, যা ন্যায়বিচারের মৌলিক নীতি রক্ষা করবে।
এই মামলায় অব্যাহত অমীমাংসা দেশের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে রাজনৈতিক সহিংসতার বিরুদ্ধে কঠোর পদক্ষেপের প্রয়োজনীয়তা পুনরায় তুলে ধরেছে। ন্যায়বিচার সম্পূর্ণ না হওয়া পর্যন্ত জুবায়েরের স্মৃতি ও তার পরিবারের কষ্ট অব্যাহত থাকবে।



