তাঙ্গাইল শাড়ি, যা ইউনেস্কোর অমূর্ত সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য তালিকায় অন্তর্ভুক্ত, আন্তর্জাতিক ফ্যাশন ক্যাটালগ, উৎসব প্রদর্শনী এবং সাংস্কৃতিক শিরোনামে স্থান পেয়েছে। তবে এই গ্লোবাল স্বীকৃতির পেছনে তাঙ্গাইলের গাঁয়ের বুননকারীদের জীবনযাত্রা এখনও অস্থির ও অবহেলিত।
বিশ্বের বিভিন্ন ফ্যাশন শোতে তাঙ্গাইল শাড়ি মডেল হিসেবে দেখা যায়, এবং বিদেশি ক্রেতা এই ঐতিহ্যবাহী পণ্যের জন্য উচ্চমূল্য প্রদান করে। দেশের অভ্যন্তরে উৎসব ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে শাড়ির চাহিদা বাড়ার ফলে স্থানীয় বাজারে এর দামও উর্ধ্বমুখী হয়েছে।
ইউনেস্কোর স্বীকৃতি তাঙ্গাইল শাড়ির শিল্পকে আন্তর্জাতিক মঞ্চে তুলে ধরলেও, বুননকারীদের আর্থিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে যথেষ্ট নয়। ঐ স্বীকৃতি মূলত শাড়ির নকশা, রঙের বৈচিত্র্য এবং ঐতিহ্যবাহী বুনন পদ্ধতিকে গুরুত্ব দেয়।
তাঙ্গাইলের পাথরাইল, নগরপুর, কালীহাটি, বাসাইল, বাল্লা এবং সোনতোষের গৃহস্থালী ঘরে প্রতিদিন সকালবেলা লুমের শব্দ শোনা যায়। কাঠের ফ্রেমে সূক্ষ্মভাবে সূতা টানা, টানানো ও মুক্তি দেওয়ার কাজ ধারাবাহিকভাবে চালিয়ে যায় বুননকারীরা।
বুননের আগে সূতা মার প্রক্রিয়ার মাধ্যমে প্রস্তুত করা হয়; এই প্রক্রিয়ায় নদীর স্বচ্ছ জল ব্যবহার করা হয়, যা সূতাকে নরম ও মজবুত করে। মারের জন্য দরকারি জল তাঙ্গাইলের ধলেশ্বরী ও লৌহাজং নদীর স্বচ্ছ, লোহার মুক্ত পানি, যা ঐ অঞ্চলের বিশেষ ভূগোলিক বৈশিষ্ট্য।
ধলেশ্বরী ও লৌহাজং নদীর জলের স্বচ্ছতা ও লোহার অমিল তাঙ্গাইল শাড়ির গুণগত মানের মূল ভিত্তি। একই নকশা অন্যত্র তৈরি হলেও, তাঙ্গাইলের নদীর জলে মার করা সূতা না থাকলে শাড়ির নরমত্ব, ড্রেপ এবং দীর্ঘস্থায়িত্বে পার্থক্য দেখা যায়।
স্থানীয় বুননকারি সংস্থা নিলকমল বসাকের মতে, এই নদীগুলোর পরিষ্কার জলই তাঙ্গাইলের বুনন শিল্পের প্রাণশক্তি। তিনি উল্লেখ করেন, পূর্বপুরুষের সময়ে এই নদীর জল এত স্বচ্ছ ছিল যে কোনো ধরনের বুননের জন্য আদর্শ ছিল।
বুননকারীদের জন্য এই ঐতিহ্যবাহী দক্ষতা আর্থিক নিরাপত্তা দেয় না। আধুনিক বাজারে চাহিদা বাড়লেও, বুননকারীরা প্রায়শই কম দামে কাজ করে এবং তাদের শ্রমের যথাযথ মূল্যায়ন হয় না।
বাজারের চাহিদা এবং উচ্চ মূল্যের আকাঙ্ক্ষা মাঝখানে বুননকারীদের মজুরি ও কাজের শর্তকে কঠিন করে তুলেছে। অনেক বুননকারী পরিবার এখনো মৌলিক স্বাস্থ্যসেবা ও শিক্ষার সুযোগ থেকে বঞ্চিত, যদিও তাদের পণ্য আন্তর্জাতিক পর্যায়ে প্রশংসিত।
সরকারি ও বেসরকারি সংস্থার সহায়তা সীমিত থাকায়, বুননকারীরা স্বনির্ভরতা অর্জনে সংগ্রাম করে। কিছু উদ্যোগে প্রশিক্ষণ ও আর্থিক সহায়তা দেওয়া হয়েছে, তবে তা সব বুননকারী গোষ্ঠীর কাছে পৌঁছায় না।
এই পরিস্থিতি তাঙ্গাইলের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যকে ঝুঁকির মুখে ফেলছে, কারণ নতুন প্রজন্মের বুননকারীরা আর এই শিল্পে প্রবেশ করতে অনিচ্ছুক। ঐতিহ্য সংরক্ষণে সমন্বিত নীতি ও বুননকারীদের জন্য স্থায়ী আয় নিশ্চিত করা জরুরি।
তাঙ্গাইল শাড়ির গ্লোবাল জনপ্রিয়তা ও ইউনেস্কো স্বীকৃতি সত্ত্বেও, বুননকারীদের জীবনের মান উন্নত করা এখনই প্রয়োজন। স্থানীয় সম্প্রদায়, নীতি নির্ধারক এবং আন্তর্জাতিক ক্রেতা একসাথে কাজ করে এই ঐতিহ্যবাহী শিল্পকে টেকসই ভবিষ্যৎ দিতে পারবে।



