গোলাম কাসেম ড্যাডি, যিনি ১৯১৯ সালে উপ-নিবন্ধক হিসেবে সরকারি চাকরি গ্রহণ করেন, তার জীবনের গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তগুলো আজ নতুন আলোতে দেখা যাচ্ছে। তার বয়স চব্বিশ বছর যখন তিনি ইন্টারমিডিয়েট শেষ করছিলেন, তখনই তার পিতা, খান সাহেব গোলাম রাব্বানি, যিনি কলকাতার ইন্সপেক্টর জেনারেল অফিসে সুপারিনটেনডেন্ট ছিলেন, তার ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বিগ্ন হন। তিনি জানালেন, বয়সের সীমা অতিক্রম করলে চাকরির সুযোগ কমে যাবে, তাই ড্যাডিকে তাড়াতাড়ি কোনো কর্মস্থলে যুক্ত হতে পরামর্শ দিলেন। ড্যাডি এই পরামর্শ মেনে, শিক্ষার পথে না গিয়ে সরকারি পদ গ্রহণের সিদ্ধান্ত নেন।
ড্যাডির পিতার নেটওয়ার্কের সাহায্যে তাকে উপ-নিবন্ধকের পদ দেওয়া হয় এবং প্রথম প্রশিক্ষণ ছয় মাসের জন্য নির্ধারিত হয়। প্রথম পোস্টিং হয় হাওড়া, এরপর পাডুং এবং শেষ পর্যন্ত ব্যাংকুরা। ব্যাংকুরায় তিনি বেশ কয়েক বছর কাজ করেন, যেখানে তার কর্মজীবনের বেশিরভাগ সময় কাটে। এই সময়কালে তিনি ফটোগ্রাফি ও লেখালেখিতে গভীর আগ্রহ গড়ে তোলেন, যা পরে তার স্ব-ছবির মাধ্যমে প্রকাশ পায়।
ড্যাডি যে স্ব-ছবি তোলেন, তা ১৯২০ সালে হাওড়ায় নেওয়া হয়। ঐ সময়ের ফটোগ্রাফিক পটভূমি হিসেবে সাধারণত কালো কাপড় ব্যবহার করা হতো; এই ছবিতেও একই রকম ব্যাকড্রপ দেখা যায়। ড্যাডি সাদা টি-শার্টের ওপর কোটা পরিহিত ছিলেন, এবং ক্যামেরার লেন্সের সামান্য উপরে, সামান্য বিচ্যুত দৃষ্টিতে ক্যামেরা থেকে দূরে তাকিয়ে আছেন। এই ছবি, যা এখন পর্যন্ত প্রকাশিত না হওয়া পর্যন্ত প্রায় নব্বই বছর গোপন রয়ে গিয়েছিল, তা বাংলার মুসলিম সমাজের প্রথম স্ব-ছবি হিসেবে স্বীকৃত।
এই ঐতিহাসিক স্ব-ছবিটি পুনরায় প্রকাশের দায়িত্ব নেন বিশিষ্ট ফটোগ্রাফার নাসির আলি মামুন। তিনি ২০১১ সালের ঈদ বিশেষ সংখ্যা ‘ইত্তেফাক’ পত্রিকায় দশ পৃষ্ঠার একটি প্রবন্ধ লিখে এই ছবিটিকে জনসাধারণের সামনে আনেন। প্রবন্ধের শিরোনাম ছিল “পূর্ববাংলার ফটোগ্রাফি : রাজসাক্ষী গোলাম কাসেম ড্যাডি” এবং ছবিটি সেই প্রবন্ধের পৃষ্ঠা ৪৯৩-এ প্রকাশিত হয়। এই প্রকাশের মাধ্যমে ড্যাডির স্ব-ছবি দীর্ঘ সময়ের পর আলোকিত হয় এবং বাংলার ফটোগ্রাফি ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ নিদর্শন হিসেবে স্বীকৃত হয়।
ড্যাডির স্ব-ছবির গুরুত্ব কেবল তার শিল্পমূল্যেই নয়, বরং তা তার সময়ের সামাজিক ও সাংস্কৃতিক প্রেক্ষাপটকে প্রতিফলিত করে। ১৯১৯ সালের পরের সময়ে, যখন প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পরের পুনর্গঠন চলছিল, তখন সরকারি চাকরি ও শিক্ষা নিয়ে তরুণদের মধ্যে দ্বিধা দেখা দিত। ড্যাডির পিতার উদ্বেগ ও তার নিজের সিদ্ধান্তের মাধ্যমে দেখা যায়, কীভাবে পরিবারিক দায়িত্ব ও ব্যক্তিগত স্বপ্নের মধ্যে সমন্বয় করা হয়। একই সঙ্গে, স্ব-ছবি তোলার মাধ্যমে তিনি নিজের পরিচয় ও আত্মপ্রকাশের নতুন পথ খুলে দেন, যা আজকের সেলফি যুগের পূর্বসূরী হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।
ড্যাডি তার কর্মজীবন শেষে, ফটোগ্রাফি ও লেখালেখিতে অবদান রাখেন এবং তার স্ব-ছবি ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য একটি রেফারেন্স পয়েন্ট হয়ে দাঁড়ায়। তার জীবনের এই দিকগুলো, যা এখন পুনরায় আলোচিত হচ্ছে, আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয় যে, ব্যক্তিগত সৃজনশীলতা ও সরকারি দায়িত্বের মধ্যে সমন্বয় সম্ভব, এবং ঐতিহাসিক নথি ও ছবি আমাদের অতীতের সত্যিকারের চিত্র তুলে ধরতে পারে।
আজকের পাঠকরা যখন ড্যাডির স্ব-ছবি দেখেন, তখন তিনি কেবল একটি ছবি নয়, বরং একটি সময়ের সাক্ষী, একটি সামাজিক পরিবর্তনের অংশ এবং ফটোগ্রাফি শিল্পের একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হিসেবে তার স্থান পুনরায় নিশ্চিত হয়। তার গল্প থেকে আমরা শিখতে পারি, কীভাবে ব্যক্তিগত আগ্রহ ও পেশাগত দায়িত্বকে একসাথে চালিয়ে যাওয়া যায়, এবং কীভাবে ঐতিহাসিক নথিগুলোকে সংরক্ষণ করে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দেওয়া যায়।



