শুক্রবার (১০ জানুয়ারি) সকালে রাজধানীর একটি পরামর্শক সভায় স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা প্যাকেটজাত খাবারের মোড়কে চিনি, লবণ ও ট্রান্সফ্যাটের পরিমাণ স্পষ্টভাবে দেখানোর বাধ্যতামূলক ব্যবস্থা গ্রহণের আহ্বান জানালেন। সভার মূল বিষয় ছিল “জনস্বাস্থ্য রক্ষায় ফ্রন্ট‑অফ‑প্যাকেজ লেবেলিং” এবং এতে উপস্থিতদের সম্মিলিত লক্ষ্য ছিল ভোক্তাদের জন্য স্বচ্ছ পুষ্টি তথ্য নিশ্চিত করা।
বিশেষজ্ঞরা উল্লেখ করেন, দেশের মোট মৃত্যুর প্রায় ৭০ শতাংশই অসংক্রামক রোগের ফলে ঘটছে এবং এই রোগগুলোর প্রধান কারণগুলোর মধ্যে অতিরিক্ত চিনি, লবণ ও ট্রান্সফ্যাটের গ্রহণ রয়েছে। এ ধরনের রোগের ঝুঁকি কমাতে প্যাকেটজাত খাবারের লেবেলে সঠিক তথ্য প্রদান অপরিহার্য বলে তারা জোর দেন।
জাতীয় পরিসংখ্যান অনুযায়ী, দেশের ৯৭ শতাংশ মানুষ প্রতি সপ্তাহে কমপক্ষে একবার প্যাকেটজাত খাবার ব্যবহার করে। তবে অধিকাংশ পণ্যই পুষ্টি তথ্যের অভাবে ভোক্তাদের জন্য বিভ্রান্তিকর রয়ে যায়, যার ফলে স্বাস্থ্যঝুঁকি বাড়ে। স্পষ্ট লেবেল না থাকলে মানুষ অজান্তেই উচ্চ চিনি, লবণ বা ট্রান্সফ্যাটযুক্ত পণ্য গ্রহণ করতে পারে।
বছরে প্রায় ৬৪ লাখ মানুষ চিকিৎসা ব্যয়ের কারণে দারিদ্র্যের মুখে পড়ে, যা দেশের সামাজিক ও অর্থনৈতিক উন্নয়নের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ। স্বাস্থ্যকর পণ্য নির্বাচন সহজ করতে লেবেলিং বাধ্যতামূলক করা হলে এই আর্থিক বোঝা হ্রাস পেতে পারে।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO) ফ্রন্ট‑অফ‑প্যাকেজ লেবেলিং (FoPL) ব্যবস্থা সুপারিশ করে, যেখানে পণ্যের সামনের অংশে ক্ষতিকর উপাদানের মাত্রা ও সতর্কতা চিহ্নিত করা হয়। এই পদ্ধতি ভোক্তাদের দ্রুত সিদ্ধান্ত নিতে সহায়তা করে এবং উৎপাদনকারীদের স্বচ্ছতা বজায় রাখতে বাধ্য করে।
লেবেলে “উচ্চ”, “মাঝারি” বা “কম” স্তর স্পষ্টভাবে দেখানো হলে গ্রাহকরা স্বল্প সময়ে পণ্যের স্বাস্থ্যগত প্রভাব বুঝতে পারবেন। ফলে তারা কম চিনি, কম লবণ বা ট্রান্সফ্যাটমুক্ত বিকল্প বেছে নিতে উৎসাহিত হবে, যা দীর্ঘমেয়াদে অসংক্রামক রোগের হার কমাতে সহায়ক হবে।
বিশেষজ্ঞরা উদ্বেগ প্রকাশ করেন, স্পষ্ট লেবেল না থাকলে বিশেষ করে শিশুরা রঙিন প্যাকেজিং ও আকর্ষণীয় বিজ্ঞাপনের শিকার হয়। কার্বনেটেড পানীয় ও ফলের জুসের মোড়কে প্রায়শই স্বাস্থ্য সতর্কতা অনুপস্থিত থাকে, যা আন্তর্জাতিক মানের বিরোধী। এই পরিস্থিতি শিশুদের অতিরিক্ত চিনি গ্রহণের ঝুঁকি বাড়ায়।
তারা জোর দিয়ে বলেন, বিজ্ঞানভিত্তিক FoPL ব্যবস্থা দ্রুত বাস্তবায়ন করা প্রয়োজন এবং এতে স্বার্থান্বেষী গোষ্ঠীর হস্তক্ষেপ না থাকা উচিত। স্বচ্ছ লেবেলিং নীতি গ্রহণের মাধ্যমে বাজারে ন্যায়সঙ্গত প্রতিযোগিতা নিশ্চিত হবে এবং ভোক্তাদের স্বাস্থ্যের সুরক্ষা নিশ্চিত হবে।
সভায় উপস্থিত ছিলেন বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের সদস্য অধ্যাপক ড. মো. শোয়েব, বিএসটিআইয়ের উপপরিচালক ইঞ্জিনিয়ার মো. আব্দুল্লাহ আল মামুন, গ্লোবাল হেলথ ইনিশিয়েটিভের কান্ট্রি লিড অ্যাডভোকেট মো. রুহুল কুদ্দুস, বিএসএমএমইউয়ের জনস্বাস্থ্য বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. মো. আতিকুল হক এবং আর্ক ফাউন্ডেশনের নির্বাহী পরিচালক অধ্যাপক রুমানা হক। সবাই একমত যে, লেবেলিং বাধ্যতামূলক করা হলে ভোক্তাদের সচেতনতা বৃদ্ধি পাবে এবং স্বাস্থ্যকর পণ্যের চাহিদা বাড়বে।
শেষে বিশেষজ্ঞরা সুপারিশ করেন, সরকার দ্রুত আইন প্রণয়ন করে ফ্রন্ট‑অফ‑প্যাকেজ লেবেলিংকে বাধ্যতামূলক করে এবং নিয়মিত পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থা গড়ে তোলার মাধ্যমে বাস্তবায়ন নিশ্চিত করুক। এ ধরনের পদক্ষেপ দেশের স্বাস্থ্যসেবা ব্যয় কমাতে এবং জনস্বাস্থ্যের উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। আপনার মতামত কী—আপনি কি এই লেবেলিং ব্যবস্থা সমর্থন করবেন?



