ব্রাহ্মণবাড়িয়া-১ আসনে ৭ জানুয়ারি ২০২৪ অনুষ্ঠিত দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে স্বতন্ত্র প্রার্থী একরামুজ্জামান ৮৯,৪২৪ ভোট নিয়ে প্রথমবারের মতো সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। তার প্রতিদ্বন্দ্বী বি এম ফরহাদ হোসেন, যিনি পূর্বে দু’বার সংসদ সদস্য ছিলেন, নৌকা প্রতীকে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন এবং একই বছর আওয়ামী লীগে যোগ দেন।
একরামুজ্জামান, যিনি আরএকে সিরামিকসের ব্যবস্থাপনা পরিচালক, পূর্বে বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার উপদেষ্টা হিসেবে কাজ করতেন। দলীয় সিদ্ধান্তের বিরোধে তিনি দ্বাদশ নির্বাচনে স্বতন্ত্রভাবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার পর দল থেকে বহিষ্কৃত হন। তার রাজনৈতিক ক্যারিয়ার ৯ম ও ১১শ জাতীয় নির্বাচনে বিএনপি প্রার্থী হিসেবে শুরু হয়, যদিও উভয়বারই তিনি পরাজিত হন।
ইলেকশন কমিশন (ইসি) একরামুজ্জামানের স্বতন্ত্র প্রার্থীর মনোনয়ন অবৈধ ঘোষণা করে, যা তার নির্বাচিত হওয়ার পরেও প্রযোজ্য। কমিশনের মতে, তার প্রার্থিতা প্রক্রিয়ায় কিছু নিয়ম লঙ্ঘন হয়েছে, ফলে তার পার্লামেন্টে বসার অধিকার নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। বর্তমানে একরামুজ্জামান ও তার সমর্থকরা আইনি পথে আপিলের সম্ভাবনা প্রকাশ করেছেন, যা সংসদের গঠন ও স্বতন্ত্র প্রার্থীর অবস্থানকে প্রভাবিত করতে পারে।
বিএনপি-র স্থানীয় সংগঠন, বিশেষ করে নাসিরনগর উপজেলার সভাপতি আবদুল হান্নান, এই নির্বাচনে দলের একমাত্র প্রার্থী হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন। তবে তিনি ভোটে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি করতে পারেননি। ব্রাহ্মণবাড়িয়া-১ আসনে ১৯৭০ সালের পর থেকে কখনোই বিএনপি জয়লাভ করতে পারেনি; ঐতিহাসিকভাবে আওয়ামী লীগ আটবার, জাতীয় পার্টি দুবার, ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি একবার এবং স্বতন্ত্র প্রার্থী দুবার জয়লাভ করেছে।
একরামুজ্জামানের জয় তার রাজনৈতিক অবস্থানকে নতুন মোড় দিয়েছে। স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে প্রথমবারের মতো সংসদে প্রবেশ করা তিনি, স্থানীয় স্তরে তার প্রভাব বাড়াতে পারেন এবং ভবিষ্যতে দলীয় নীতি ও কৌশল নিয়ে আলোচনা করতে পারেন। তবে ইসির সিদ্ধান্তের পরিপ্রেক্ষিতে তার পার্লামেন্টে বসার অধিকার নিয়ে চলমান আইনি প্রক্রিয়া তার কার্যক্রমকে সীমাবদ্ধ করতে পারে।
অন্যদিকে, বি এম ফরহাদ হোসেনের আওয়ামী লীগে যোগদানের পর তিনি জেলা আওয়ামী লীগ কমিটিতে উপদেষ্টা নিযুক্ত হন। তবে তিনি দাবি করেন যে, কমিটি ঘোষণার পরই তিনি নিজের পদত্যাগপত্র দলীয় কার্যালয়ে জমা দিয়েছেন, যা তার রাজনৈতিক অবস্থানকে জটিল করে তুলেছে। তার এই পদক্ষেপের পেছনে নির্বাচনী ফলাফল ও পার্টি অভ্যন্তরীণ গতি-প্রকৃতির প্রভাব থাকতে পারে।
একরামুজ্জামান ৯ জানুয়ারি ২০২৬ তারিখে ধানের শীষের সমর্থনে রাজনৈতিক মঞ্চ থেকে সরে দাঁড়ানোর ঘোষণা দেন। যদিও তার এই সিদ্ধান্তের কারণ স্পষ্ট নয়, তবে এটি তার ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক পরিকল্পনা ও পার্টি গঠনে প্রভাব ফেলতে পারে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা উল্লেখ করেন যে, স্বতন্ত্র প্রার্থীর জয় এবং ইসির বৈধতা সংক্রান্ত বিতর্ক ভবিষ্যতে অন্যান্য স্বতন্ত্র প্রার্থীর জন্যও দৃষ্টান্ত স্থাপন করতে পারে। যদি আদালত একরামুজ্জামানের পার্লামেন্টে বসার অধিকার নিশ্চিত করে, তবে স্বতন্ত্র প্রার্থীর প্রভাব বাড়বে; অন্যদিকে, যদি মনোনয়ন অবৈধ বলে চূড়ান্ত রায় আসে, তবে স্বতন্ত্র প্রার্থীর জন্য বাধা সৃষ্টি হবে।
ব্রাহ্মণবাড়িয়া-১ আসনের এই নির্বাচনী ফলাফল এবং ইসির সিদ্ধান্ত দেশের রাজনৈতিক দৃশ্যপটে নতুন প্রশ্ন উত্থাপন করেছে। পার্লামেন্টের গঠন, স্বতন্ত্র প্রার্থীর ভূমিকা এবং দলীয় নীতি-নির্ধারণে এই ঘটনা কীভাবে প্রভাব ফেলবে, তা সময়ের সাথে স্পষ্ট হবে।



