ময়মনসিংহের পাঙাশ চাষে দীর্ঘদিন ধরে ব্যাকটেরিয়াল হেমোরেজিক সেপসিমিয়া ও ইডওয়ার্ডসিলা ইক্টালুরি‑সৃষ্ট ইন্টারিক সেপসিমিয়া রোগের প্রভাবের ফলে বড় ক্ষতি হচ্ছে; বাংলাদেশ মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউট (বিএফআরআই) এই রোগগুলো প্রতিরোধে কার্যকর ভ্যাকসিন তৈরি করেছে। পরীক্ষায় সফলতা নিশ্চিত হওয়ায় শীঘ্রই খামারিদের কাছে সরবরাহের পরিকল্পনা রয়েছে। এই পদক্ষেপের ফলে অঞ্চলের মাছ উৎপাদন ও আয় পুনরুদ্ধারে সহায়তা পাওয়া আশা করা হচ্ছে।
ময়মনসিংহকে প্রায়ই “মাছের রাজধানী” বলা হয়; ত্রিশাল, মুক্তাগাছা, ফুলবাড়িয়া ও ভালুকা উপজেলাগুলোতে পাঙাশ চাষ গ্রামীণ অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তি। জেলায় বছরে সাড়ে বারো হাজার কোটি টাকার মাছ উৎপাদন হয়, যার বেশিরভাগই পাঙাশ থেকে আসে। তবে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ভাইরাসের আক্রমণে এই উৎপাদন ধারাবাহিকভাবে হ্রাস পেয়েছে।
প্রধান শত্রু হিসেবে পরিচিত ব্যাকটেরিয়াল হেমোরেজিক সেপসিমিয়া (BHS) রোগের ফলে মাছের পেটের নিচে রক্তাক্ত দাগ দেখা যায়, আর লিভার ও কলিজা দ্রুত পচে যায়। একই সঙ্গে ইন্টারিক সেপসিমিয়া অফ ক্যাটফিশ (ইএসসি) রোগ, যা স্থানীয়ভাবে “মাথা পচা” নামে পরিচিত, মাছের মাথায় ছোট ছিদ্র তৈরি করে এবং দ্রুত মৃত্যুর কারণ হয়। এই দুই রোগের সংমিশ্রণ পাঙাশ ফার্মগুলোকে দিশেহারা করে তুলেছে।
রোগের বিস্তারকে ত্বরান্বিত করে পুকুরের তলদেশে জমে থাকা ময়লা ও বাড়তি অ্যামোনিয়া গ্যাস। অতিরিক্ত ঘনত্বে মাছ চাষ, অর্থাৎ ওভারস্টকিং, সমস্যাটিকে আরও বাড়িয়ে দেয়। এক বিঘা জলাশয়ে আদর্শভাবে তিন থেকে চার হাজার পোনা রাখা উচিত, তবে বাস্তবে অনেক ফার্মে দশ থেকে বারো হাজার পোনা রাখা হয়। অতিরিক্ত ঘনত্বের ফলে পানির অক্সিজেনের মাত্রা দ্রুত কমে যায়; যখন অক্সিজেনের স্তর ৩.০ ppm-এর নিচে নেমে যায়, তখন রোগজীবাণু সক্রিয় হয়ে মাছের মৃত্যুর হার বাড়িয়ে দেয়।
পাঙাশের উচ্চ বর্জ্য উৎপাদনও পানির গুণগত মানকে প্রভাবিত করে। বর্জ্য পচে পানিতে অক্সিজেনের ঘাটতি সৃষ্টি করে, যা রোগের প্রাদুর্ভাবের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত। একই সঙ্গে, গত দুই বছরে মাছের খাবারের দাম কেজিতে ২০ থেকে ৩০ টাকা বাড়ে, ফলে এক কেজি পাঙাশ উৎপাদনের খরচ ১১০ থেকে ১২০ টাকায় পৌঁছেছে। খাবারের খরচের এই বৃদ্ধি মোট উৎপাদন খরচের প্রায় ৮০ শতাংশ গঠন করে, যা চাষীদের আর্থিক চাপ বাড়িয়ে দেয়।
বিএফআরআই-র বিজ্ঞানীরা বহু বছর ধরে রোগের কারণ ও প্রভাব বিশ্লেষণ করে ভ্যাকসিনের সূত্রপাত করেন। গবেষণায় দেখা গেছে, ভ্যাকসিনটি ব্যাকটেরিয়াল হেমোরেজিক সেপসিমিয়া ও ইডওয়ার্ডসিলা ইক্টালুরি উভয়ের বিরুদ্ধে ইমিউন প্রতিক্রিয়া জাগিয়ে তুলতে সক্ষম। পরীক্ষামূলক পুকুরে ভ্যাকসিন প্রয়োগের পর রোগের ঘটনার হার উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যায় এবং মাছের বেঁচে থাকার হার বৃদ্ধি পায়।
বিএফআরআই এখন ভ্যাকসিনের বাণিজ্যিক উৎপাদন পর্যায়ে অগ্রসর হয়েছে এবং শীঘ্রই পাঙাশ চাষীদের কাছে সরবরাহের পরিকল্পনা চালু করেছে। সরবরাহের সঙ্গে সঙ্গে প্রশিক্ষণ ও ব্যবহার নির্দেশিকা প্রদান করা হবে, যাতে চাষীরা সঠিক ডোজ ও সময়সূচি মেনে ভ্যাকসিন ব্যবহার করতে পারে। এই উদ্যোগের মাধ্যমে রোগের বিস্তার নিয়ন্ত্রণে এবং উৎপাদন পুনরুদ্ধারে সহায়তা পাওয়া যাবে বলে আশা করা হচ্ছে।
পাঙাশ চাষের ভবিষ্যৎ রক্ষার জন্য ভ্যাকসিনের পাশাপাশি পরিবেশগত ব্যবস্থাপনা, সঠিক ঘনত্ব নির্ধারণ এবং সুষম খাবার সরবরাহের গুরুত্ব অপরিহার্য। চাষীরা যদি নিয়মিত পানির গুণমান পর্যবেক্ষণ, অতিরিক্ত স্টকিং এড়ানো এবং ভ্যাকসিনের সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত করেন, তবে রোগের ঝুঁকি কমে যাবে এবং লাভজনকতা বাড়বে। এই প্রেক্ষাপটে, মৎস্য গবেষণা সংস্থার নতুন ভ্যাকসিন কি পাঙাশ শিল্পের পুনর্জাগরণে মূল ভূমিকা পালন করবে, তা সময়ই প্রকাশ করবে।



