ঢাকা, ১০ জানুয়ারি – মধ্যাহ্নে সিরডাপ মিলনায়তনে সেন্টার ফর গভর্নেন্স স্টাডিজ (সিজিএস) আয়োজিত রাজনৈতিক দল, মানবাধিকার ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতা বিষয়ক পলিসি ডায়ালগে ইন্টারিম সরকারের আইন উপদেষ্টা ড. আসিফ নজরুল তার অভিজ্ঞতা ও সংস্কার পরিকল্পনা তুলে ধরেন। তিনি ১৫ বছর পাকিস্তানের দালাল হিসেবে কাজ করেছেন এবং এক রাতের মধ্যে ভারতের দালাল হয়ে গেছেন, এ কথা উল্লেখ করে নিজের সাইবার বুলিং শিকারীর রেকর্ডও তুলে ধরেন।
ড. নজরুল বলেন, তিনি গত ১৬ মাসে দেশের সর্বোচ্চ সাইবার বুলিং শিকারী এবং এ বিষয়ে কোনো অন্য ব্যক্তি তার চেয়ে বেশি শিকার হয়নি। এই দাবি তিনি ইভেন্টে উপস্থিত বিভিন্ন রাজনৈতিক ও মানবাধিকার কর্মীর সামনে প্রকাশ করেন। তিনি অতীতের সংগ্রামকে স্মরণ করে বলেন, বহু বছর ধরে তিনি সংস্কারের জন্য লড়াই করে আসছেন এবং সরকারের ব্যর্থতা সমালোচনার সময় যুক্তিসঙ্গত দিকগুলোকে স্বীকৃতি দেওয়া দরকার।
তিনি উদাহরণ দিয়ে ব্যাখ্যা করেন, যদি সরকার দশটি বিষয়ের মধ্যে চারটি সম্পন্ন করে, তবে প্রথমে সেসব চারটি কাজের স্বীকৃতি দেওয়া উচিত। বাকি ছয়টি কেন করা যায়নি, তা নিয়ে কঠোর সমালোচনা করা যায়, তবে সম্পূর্ণ ব্যর্থতা দাবি করা ন্যায়সঙ্গত নয়। এভাবে সমালোচনা স্বার্থপরতা বা আত্মতৃপ্তির দিকে না গিয়ে সৎ বিশ্লেষণে পরিণত হবে, তিনি যুক্তি দেন।
বিচার বিভাগের সংস্কার নিয়ে কথা বলার সময় ড. নজরুল উল্লেখ করেন, দেশের ইতিহাসে প্রথমবার উচ্চ আদালতকে পদ সৃষ্টি, বদলি, পদোন্নতি, বাজেট বরাদ্দ ও বাজেট ব্যবস্থাপনার সব ক্ষমতা প্রদান করা হয়েছে। তিনি বলেন, এই পরিবর্তনগুলো কোনো জাদু নয়, তবে আইনের শাসন ও মানবাধিকার প্রতিষ্ঠার ভিত্তি গড়ে তুলবে। ৫৪ বছরের ইতিহাসে এ ধরনের বিস্তৃত ক্ষমতা হস্তান্তর আগে কখনো দেখা যায়নি।
ড. নজরুল একটি গুম কমিশনের কার্যকারিতা তুলে ধরে বলেন, এই কমিশন মানবাধিকার কমিশন আইন সংস্কারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। তিনি দাবি করেন, বর্তমান মানবাধিকার আইন দক্ষিণ এশিয়ার অন্যান্য দেশের তুলনায় উন্নত অবস্থানে রয়েছে এবং শীঘ্রই নতুন নিয়োগের মাধ্যমে মানবাধিকার কমিশনের কার্যক্রম শক্তিশালী হবে।
সিভিল রেজিস্ট্রেশন প্রসিডিউর কোড (সিআরপিসি) ও সিভিল প্রসিডিউর কোড (সিপিসি) সংস্কার সম্পর্কেও ড. নজরুল মন্তব্য করেন। তিনি বলেন, ৫৪ বছরের মধ্যে যে সংস্কারগুলো ম্লানভাবে রয়ে গিয়েছিল, সেগুলো এখন দ্রুত অগ্রসর হচ্ছে। বিশেষ করে সরকারি লিগ্যাল এইড অধিদপ্তরকে পূর্বের দশ গুণ বেশি কার্যকর করা হয়েছে, যা সাধারণ নাগরিকের আইনি সহায়তা সহজতর করবে।
ইভেন্টে উপস্থিত অংশগ্রহণকারীরা ড. নজরুলের বক্তব্যে সম্মতি জানিয়ে বলেন, সংস্কার প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা বজায় রাখা জরুরি। কিছু বিশ্লেষকও ইঙ্গিত করেন, সরকারকে সমালোচনা করার সময় বাস্তবিক ফলাফলকে গুরুত্ব দিয়ে সমালোচনা করা উচিত, যাতে রূপকথা নয়, বাস্তব উন্নয়ন হয়।
ড. নজরুলের মন্তব্যের পর একটি প্রশ্নোত্তর সেশনে অংশগ্রহণকারীরা জিজ্ঞাসা করেন, নতুন মানবাধিকার আইন কীভাবে বাস্তবায়িত হবে এবং বিচার বিভাগের ক্ষমতা হস্তান্তরের পর কী ধরনের তদারকি ব্যবস্থা থাকবে। তিনি উত্তর দেন, আইনগত কাঠামোতে স্বতন্ত্র তদারকি কমিটি গঠন করা হবে এবং নিয়মিত পর্যালোচনা প্রক্রিয়া চালু থাকবে।
সিজিএসের প্রতিনিধিও ইভেন্টের শেষে উল্লেখ করেন, এই ধরনের পলিসি ডায়ালগ সরকার, রাজনৈতিক দল ও সিভিল সোসাইটি সংস্থার মধ্যে সংলাপ বাড়াতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। তারা আশা প্রকাশ করেন, ড. নজরুলের মতামত ও প্রস্তাবনা বাস্তবায়নে সকল সংশ্লিষ্ট পক্ষের সমন্বিত প্রচেষ্টা প্রয়োজন।
ড. আসিফ নজরুলের বক্তব্যের ভিত্তিতে সরকার আগামী মাসে মানবাধিকার কমিশনের নতুন সদস্যদের নিয়োগের পরিকল্পনা করেছে। পাশাপাশি, বিচার বিভাগের ক্ষমতা হস্তান্তরের পর উচ্চ আদালতের তদারকি নিশ্চিত করার জন্য একটি বিশেষ গোষ্ঠী গঠন করা হবে বলে জানানো হয়েছে।
এইসব ঘোষণার পর বিশ্লেষকরা মন্তব্য করেন, সংস্কার প্রক্রিয়ার সাফল্য নির্ভর করবে বাস্তবায়নের গতি ও স্বচ্ছতার ওপর। যদি সরকার প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী পদক্ষেপ নেয়, তবে দেশের আইনি ও মানবাধিকার পরিবেশে উল্লেখযোগ্য উন্নতি সম্ভব। অন্যদিকে, সমালোচকরা সতর্ক করেন, রূপকথা নয়, বাস্তবিক ফলাফলই মূল মাপকাঠি হবে।
ড. আসিফ নজরুলের এই বক্তব্য ও পরিকল্পনা দেশের রাজনৈতিক ও আইনি কাঠামোতে নতুন দিগন্ত উন্মোচনের ইঙ্গিত দেয়। ভবিষ্যতে এই সংস্কারগুলো কীভাবে বাস্তবায়িত হবে এবং নাগরিকদের ওপর কী প্রভাব ফেলবে, তা পর্যবেক্ষণ করা হবে।



