ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ, দেশের প্রধান অর্থ উপদেষ্টা, শনিবার ঢাকা শহরের সিরডাপ মিলনায়তনে ব্যাংকিং অ্যালমানাকের আয়োজিত এক সমাবেশে উল্লেখ করেন যে, বর্তমান পরিস্থিতিতে ব্যাংক ঋণের সুদের হার কমানো বাস্তবিকভাবে সম্ভব নয়। তিনি বলেন, ব্যাংকিং খাতের স্থিতিশীলতা বজায় থাকলেও, সুদের হার হ্রাসের জন্য প্রয়োজনীয় শর্তগুলো এখনো পূরণ হয়নি।
উল্লেখিত সমাবেশে উপস্থিত ছিলেন অর্থসচিব খাইরুজ্জামান মজুমদার, আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের সচিব নাজমা মোবারেক, ব্যাংক অ্যাসোসিয়েশন অফ বাংলাদেশের প্রেসিডেন্ট আবদুল হাই সরকার এবং ব্যাংকিং অ্যালমানাকের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান ও পিপিআরসির চেয়ারম্যান হোসেন জিল্লুর সহ অন্যান্য বিশিষ্ট ব্যক্তিত্ব।
ড. আহমেদ জোর দিয়ে বলেন, সুদের হার হ্রাসের জন্য শুধুমাত্র সরকারের একক প্রচেষ্টা যথেষ্ট নয়; ব্যবসায়িক সম্প্রদায় এবং সাধারণ জনগণের সমন্বিত সহায়তা ছাড়া মুদ্রাস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে অগ্রগতি অর্জন করা কঠিন। তিনি উল্লেখ করেন, বর্তমান মুদ্রাস্ফীতি পরিস্থিতি এবং আন্তর্জাতিক আর্থিক পরিবেশের প্রভাবের কারণে সুদের হার হ্রাসের সম্ভাবনা সীমিত।
ব্যাংকিং খাতের স্থিতিশীলতা বজায় থাকলেও, ঋণগ্রহীতাদের জন্য উচ্চ সুদের হার অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ তৈরি করছে। উচ্চ সুদের হার ঋণগ্রহীতাদের ঋণ গ্রহণের ইচ্ছা কমিয়ে দেয়, ফলে ব্যবসা সম্প্রসারণ ও বিনিয়োগের গতি ধীর হয়ে যায়। এটি দেশের মোট উৎপাদন ও রপ্তানি সক্ষমতার উপরও প্রভাব ফেলতে পারে।
ড. আহমেদ বলেন, সরকারকে আর্থিক নীতি ও মুদ্রা নীতি সমন্বয় করে মুদ্রাস্ফীতি কমাতে হবে, যাতে সুদের হার হ্রাসের জন্য উপযুক্ত পরিবেশ তৈরি হয়। তিনি উল্লেখ করেন, সিঙ্গাপুরের অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নেওয়া যেতে পারে, তবে বাংলাদেশকে সিঙ্গাপুরের মতো দ্রুত রূপান্তর করতে হবে না; ধারাবাহিক প্রচেষ্টা ও ধৈর্যই মূল চাবিকাঠি।
অধিকন্তু, তিনি উল্লেখ করেন যে, ব্যাংক ঋণের সুদের হার হ্রাসের জন্য আর্থিক সংস্থাগুলোর ঋণ মানদণ্ডে নমনীয়তা আনা, ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা শক্তিশালী করা এবং ঋণগ্রহীতাদের আর্থিক সাক্ষরতা বৃদ্ধি করা জরুরি। এসব পদক্ষেপ ঋণগ্রহীতাদের জন্য ক্রেডিটের প্রাপ্যতা সহজ করবে এবং বাজারের তরলতা বজায় রাখবে।
সমাবেশে উপস্থিত ব্যবসায়ী ও কমিউনিটি নেতারা ড. আহমেদের আহ্বান মেনে, দেশের আর্থিক স্থিতিশীলতা ও প্রবৃদ্ধি নিশ্চিত করতে সমন্বিত পদক্ষেপ নেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেন। তারা উল্লেখ করেন, সুদের হার হ্রাসের জন্য দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা ও নীতিগত ধারাবাহিকতা প্রয়োজন, যা স্বল্পমেয়াদী রাজনৈতিক চাপে না গিয়ে বাস্তবায়িত হবে।
ড. আহমেদ ভবিষ্যৎ চ্যালেঞ্জের কথা উল্লেখ করে বলেন, আর্থিক খাতের রূপান্তর ও উন্নয়নের জন্য প্রযুক্তি গ্রহণ, ডিজিটাল ব্যাংকিং সেবা বিস্তৃতি এবং গ্রামীণ আর্থিক অন্তর্ভুক্তি বৃদ্ধি করা গুরুত্বপূর্ণ। তিনি জোর দেন, এইসব উদ্যোগের মাধ্যমে ঋণগ্রহীতাদের জন্য সাশ্রয়ী ক্রেডিট সরবরাহ করা সম্ভব হবে।
অর্থনৈতিক পরামর্শক হিসেবে ড. আহমেদ তার দায়িত্ব পালনে ব্যর্থ হবেন না, এটাই তার দৃঢ়সংকল্প। তিনি উল্লেখ করেন, দেশের আর্থিক নীতি ও বাজারের স্বচ্ছতা বৃদ্ধি করা, বিনিয়োগকারীর আস্থা জোরদার করা এবং ঋণ বাজারের কাঠামো শক্তিশালী করা তার অগ্রাধিকার।
এই সমাবেশের মূল লক্ষ্য ছিল ব্যাংকিং খাতের বর্তমান চ্যালেঞ্জগুলো তুলে ধরা এবং সমন্বিত সমাধান প্রস্তাব করা। উপস্থিত সকলের সম্মিলিত মতামত ও প্রস্তাবনা ভবিষ্যৎ নীতি নির্ধারণে প্রভাব ফেলবে বলে আশা করা হচ্ছে।
ড. আহমেদের মন্তব্যের পর, উপস্থিতরা একমত হন যে, সুদের হার হ্রাসের জন্য দীর্ঘমেয়াদী আর্থিক শৃঙ্খলা, মুদ্রাস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ এবং ব্যবসায়িক পরিবেশের উন্নতি অপরিহার্য। তারা উল্লেখ করেন, সরকার ও বেসরকারি খাতের সমন্বিত প্রচেষ্টা ছাড়া এই লক্ষ্য অর্জন কঠিন।
সারসংক্ষেপে, ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ বর্তমান আর্থিক পরিবেশে ব্যাংক ঋণের সুদের হার হ্রাসের সম্ভাবনা সীমিত বলে উল্লেখ করেন এবং সুদের হার হ্রাসের জন্য সরকার, ব্যবসা ও জনগণের সমন্বিত সহযোগিতা প্রয়োজন বলে জোর দেন। এই দৃষ্টিকোণ থেকে, দেশের আর্থিক নীতি ও বাজারের কাঠামো পুনর্বিবেচনা করা জরুরি, যাতে ভবিষ্যতে সুদের হার হ্রাসের সম্ভাবনা তৈরি হয় এবং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ত্বরান্বিত হয়।



