বাংলাদেশের স্বয়ংগ্যাস (LPG) সরবরাহে তীব্র ঘাটতির ফলে দেশের অধিকাংশ গ্যাস স্টেশনই কার্যক্রম বন্ধ করতে বাধ্য হয়েছে, যা পরিবহন খাতের ওপর সরাসরি প্রভাব ফেলছে। এই সংকটের তথ্য বাংলাদেশ সিএনজি ফিলিং স্টেশন ও কনভার্সন ওয়ার্কশপ মালিকদের সমিতির সভাপতি সিরাজুল মাওলা আজ ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটিতে অনুষ্ঠিত সংবাদ সম্মেলনে জানিয়েছেন।
স্বয়ংগ্যাস বলতে LPG‑কে বোঝানো হয়, যা যানবাহন ও যন্ত্রপাতির ইঞ্জিনে পরিষ্কার দহন এবং তুলনামূলকভাবে কম খরচে ব্যবহার করা হয়। দেশের অভ্যন্তরে এই জ্বালানির ব্যবহার ব্যাপক, বিশেষ করে ট্যাক্সি, বাস এবং লঘু ট্রাকের ক্ষেত্রে।
অত্যন্ত সীমিত সরবরাহের ফলে হাজারো LPG চালিত গাড়ির মালিক ও চালক কঠিন পরিস্থিতিতে পড়েছেন। গ্যাস পেতে গিয়ে তারা একাধিক স্টেশন ঘুরে ঘুরে ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করেন, তবু গ্যাস না পেয়ে যান। ফলে গাড়ির চলাচল ব্যাহত হচ্ছে এবং যাত্রী সেবায় বড় ধরণের বিঘ্ন ঘটছে।
সমিতির মতে, বাংলাদেশ মাসিক গড়ে প্রায় ১,৪০,০০০ টন LPG ব্যবহার করে। বর্তমান ঘাটতি এই চাহিদার তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি, যা সরবরাহ শৃঙ্খলে বড় ফাঁক তৈরি করেছে। সমিতি এ বিষয়ে বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনকে অনুরোধ জানিয়েছে যে, মোট মাসিক চাহিদার কমপক্ষে ১০ শতাংশ, অর্থাৎ ১৫,০০০ টন গ্যাস স্বয়ংগ্যাস স্টেশনগুলোকে নিয়মিত সরবরাহ নিশ্চিত করা হোক, যাতে পরিবহন খাতের মৌলিক চাহিদা পূরণ হয়।
যদি এই সংকট অব্যাহত থাকে এবং স্বয়ংগ্যাস শিল্পের কার্যক্রম সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে যায়, তবে প্রায় ১,৫০,০০০টি LPG চালিত গাড়ির মালিককে বড় আর্থিক ক্ষতির মুখোমুখি হতে হবে। তারা গ্যাস কিট সরিয়ে অন্য জ্বালানিতে পরিবর্তন করতে বাধ্য হবে, যা গাড়ির রক্ষণাবেক্ষণ খরচ বাড়াবে এবং পরিবেশগত দিক থেকে নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে।
স্টেশন মালিকদের কথায়, ঘাটতির ফলে তাদের ব্যবসায়িক ক্ষতি দ্রুত বাড়ছে। গ্যাসের অভাবে বিক্রয় হ্রাস পেয়েছে, ফলে নগদ প্রবাহে সংকট দেখা দিচ্ছে এবং কর্মী ও সরঞ্জাম রক্ষণাবেক্ষণের খরচ মেটাতে সমস্যার সম্মুখীন হচ্ছেন।
সমিতির সাধারণ সম্পাদক মো. হাসিন পারভেজও উল্লেখ করেছেন যে, সরকারকে এই জরুরি অবস্থায় দ্রুত LPG আমদানি স্বাভাবিক করা, ঘাটতির মূল কারণ তদন্ত করা এবং সমাধান করা উচিত। তিনি বলেন, জনগণকে এই সংকট থেকে রক্ষা করা সরকারী ও সংবিধানিক দায়িত্বের অংশ।
বাজার বিশ্লেষণ থেকে দেখা যায়, স্বয়ংগ্যাসের ঘাটতি সরাসরি জ্বালানি মূল্যের উত্থান ঘটাতে পারে। গ্যাসের বিকল্প হিসেবে ডিজেল ও পেট্রোলের চাহিদা বাড়বে, যা মোট জ্বালানি ব্যয়ের ওপর চাপ বাড়াবে। লজিস্টিক সেবা, বিশেষ করে নগর পরিবহনে দেরি ও খরচ বৃদ্ধি পাবে, ফলে পণ্য ও সেবার দামেও প্রভাব পড়বে। এছাড়া, গ্যাস স্টেশন বন্ধ হওয়ায় বিনিয়োগকারীর আস্থা কমে যাবে এবং ভবিষ্যতে নতুন স্টেশন স্থাপনের পরিকল্পনা স্থবির হতে পারে।
দীর্ঘমেয়াদে স্বয়ংগ্যাসের স্থিতিশীল সরবরাহ নিশ্চিত করা না হলে, দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা ও পরিবেশগত লক্ষ্য উভয়ই ঝুঁকির মুখে পড়বে। তাই, নিয়ন্ত্রক সংস্থার দ্রুত হস্তক্ষেপ, আমদানি নীতি শিথিল করা এবং গ্যাস সঞ্চয় ব্যবস্থার উন্নয়ন অপরিহার্য। এই পদক্ষেপগুলো না নেওয়া হলে, স্বয়ংগ্যাস শিল্পের পুনরুদ্ধার কঠিন হয়ে পড়বে এবং দেশের পরিবহন খাতের কার্যকারিতা হ্রাস পাবে।
সংক্ষেপে, বর্তমান LPG ঘাটতি স্বয়ংগ্যাস স্টেশন বন্ধ, গাড়ি মালিকের কষ্ট এবং ব্যবসায়িক ক্ষতির চেইন রিঅ্যাকশন সৃষ্টি করেছে। সরকার ও নিয়ন্ত্রক সংস্থার ত্বরিত পদক্ষেপ ছাড়া বাজারের অস্থিরতা বাড়বে এবং জ্বালানি খাতের সামগ্রিক স্থিতিশীলতা ঝুঁকির মধ্যে পড়বে।



