শুক্রবার সন্ধ্যায় ঢাকা শহরের সিরডাপ মিলনায়তনে অনুষ্ঠিত ব্যাংকিং অ্যালামনাই ৭ম সংস্করণের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে অর্থ উপদেষ্টা সালেহউদ্দিন আহমেদ উচ্চ সুদের হারের সমস্যার ওপর আলোকপাত করেন। তিনি উল্লেখ করেন, ঋণগ্রহীতাদের জন্য সুদের হার হ্রাস করা কোনো সহজ কাজ নয়।
সালেহউদ্দিনের মতে, ব্যাংকের ঋণ সুদের হার সরাসরি ট্রেজারি বিলের রেটের সঙ্গে যুক্ত। এই দুই রেটের মধ্যে সামঞ্জস্য না থাকলে হঠাৎ হারের হ্রাস বাজারে অস্থিরতা সৃষ্টি করতে পারে। তিনি এই সম্পর্ককে “এক পাশে চাপ দিলে অন্য পাশে বেলুনের মতো ফুলে ওঠা” রূপক দিয়ে ব্যাখ্যা করেন।
বাজারে দ্রুত হারের হ্রাসের ফলে ঋণগ্রহীতাদের আর্থিক চাপ হ্রাস পেতে পারে, তবে একই সঙ্গে ব্যাংকের লাভের মার্জিন সংকুচিত হয়। মার্জিনের এই সংকোচন ব্যাংককে অতিরিক্ত ঝুঁকি নিতে বাধ্য করতে পারে, যা আর্থিক সিস্টেমে অপ্রত্যাশিত ঝুঁকি বাড়িয়ে দেয়।
বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাতে বর্তমানে ঋণ সুদের হার তুলনামূলকভাবে উচ্চ। উচ্চ সুদের হার ব্যবসা ও ভোক্তাদের জন্য ঋণ গ্রহণকে ব্যয়বহুল করে তুলেছে, ফলে বিনিয়োগের গতি ধীর হয়ে যায়। বিশেষ করে ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোগগুলো ঋণ ব্যয়ের কারণে সম্প্রসারণ পরিকল্পনা স্থগিত করতে বাধ্য হচ্ছে।
অন্যদিকে, উচ্চ সুদের হার মুদ্রাস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে সহায়তা করতে পারে, তবে তা আর্থিক অন্তর্ভুক্তি ও অর্থনৈতিক বৃদ্ধির জন্য বাধা হয়ে দাঁড়ায়। তাই নীতি নির্ধারকদের জন্য সুদের হারকে সমন্বয় করা একটি সূক্ষ্ম ভারসাম্য রক্ষা করার কাজ।
সালেহউদ্দিন জোর দিয়ে বলেন, সুদের হার হ্রাসের ক্ষেত্রে ধারাবাহিকতা বজায় রাখা অপরিহার্য। একবারের হঠাৎ হ্রাস বাজারে অস্থিরতা সৃষ্টি করতে পারে, যা পরবর্তীতে আবার হারের বৃদ্ধি ঘটাতে পারে। এই চক্রবৃদ্ধি শেষ করতে দীর্ঘমেয়াদী নীতি দৃষ্টিভঙ্গি প্রয়োজন।
বাজার বিশ্লেষকরা এই মন্তব্যকে ইতিবাচক সংকেত হিসেবে গ্রহণ করেছেন। তারা উল্লেখ করেন, যদি কেন্দ্রীয় ব্যাংক সুদের হার হ্রাসের পরিকল্পনা স্পষ্টভাবে প্রকাশ করে এবং তা ধারাবাহিকভাবে বাস্তবায়ন করে, তবে ঋণগ্রহীতাদের আস্থা বাড়বে এবং ঋণ চাহিদা পুনরুজ্জীবিত হবে।
তবে একই সঙ্গে সতর্কতা অবলম্বন করা দরকার, কারণ অতিরিক্ত হারের হ্রাস আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর তরলতা সংকুচিত করতে পারে। তরলতা সংকোচন ব্যাংকের ঋণ দেওয়ার ক্ষমতা সীমিত করে, যা অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিকে বাধাগ্রস্ত করতে পারে।
সালেহউদ্দিনের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, সুদের হার হ্রাসের সময় ব্যাংকের ব্যালেন্স শিটের গঠন, ঋণ-ডিপোজিট অনুপাত এবং ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা নীতিগুলোকে সমন্বয় করা প্রয়োজন। এ ধরনের সমন্বয় না হলে হারের পরিবর্তন বাজারে অপ্রত্যাশিত প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করতে পারে।
ব্যাংকিং অ্যালামনাই ইভেন্টে উপস্থিত ব্যাংক কর্মকর্তারা এই বিষয়গুলো নিয়ে আলোচনা করেন এবং ভবিষ্যৎ নীতি গঠনে সমন্বিত দৃষ্টিভঙ্গি গ্রহণের প্রয়োজনীয়তা স্বীকার করেন। ইভেন্টের অংশগ্রহণকারীরা একমত হন, যে সুদের হার হ্রাসের জন্য একটি সুসংহত কৌশল দরকার, যা অর্থনীতির বিভিন্ন সেক্টরের ওপর প্রভাব বিবেচনা করে।
সারসংক্ষেপে, উচ্চ ঋণ সুদের হার হ্রাসের জন্য একধরনের সূক্ষ্ম সমন্বয় প্রয়োজন, যেখানে ট্রেজারি বিলের রেট, ব্যাংকের লাভের মার্জিন এবং বাজারের তরলতা সবই বিবেচনা করা হয়। ধারাবাহিক নীতি ও স্বচ্ছতা এই সমন্বয়ের মূল চাবিকাঠি।
অর্থ উপদেষ্টার এই মন্তব্য ভবিষ্যৎ নীতি নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ রেফারেন্স হিসেবে কাজ করবে বলে আশা করা যায়। সুদের হার হ্রাসের প্রক্রিয়ায় যদি সঠিক ভারসাম্য রক্ষা করা যায়, তবে ঋণগ্রহীতাদের আর্থিক চাপ কমবে, ব্যবসা সম্প্রসারণে সহায়তা পাবে এবং সামগ্রিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ত্বরান্বিত হবে।
ইভেন্টের সমাপ্তি ঘোষণার পর, উপস্থিত বিশ্লেষক ও ব্যাংক কর্মকর্তারা নেটওয়ার্কিং সেশনে এই বিষয়গুলো নিয়ে আরও গভীর আলোচনা চালিয়ে যান, যা দেশের আর্থিক নীতি গঠনে নতুন দৃষ্টিকোণ যোগ করবে।



