বাংলাদেশের উত্তর উপকূলের সমুদ্রসীমা প্রায় ১১৮,৮১৩ বর্গকিলোমিটার, যা দেশের বাণিজ্যিক স্বার্থের জন্য গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। ৭০০ কিলোমিটারেরও বেশি দীর্ঘ সমুদ্রতট, ১২ নটিক্যাল মাইলের স্বায়ত্তশাসিত জলের সীমা এবং তট থেকে ২০০ নটিক্যাল মাইল পর্যন্ত বিস্তৃত এক্সক্লুসিভ ইকোনমিক জোন (EEZ) দেশের আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের মূলধারার ভিত্তি গঠন করে।
বাণিজ্যিক দৃষ্টিকোণ থেকে দেখা যায়, দেশের মোট রপ্তানি-আমদানি কার্যক্রমের প্রায় ৯৪ শতাংশই সমুদ্রপথে সম্পন্ন হয়, ফলে সমুদ্রপথকে জাতীয় অর্থনৈতিক করিডোর হিসেবে বিবেচনা করা যায়। চট্টগ্রাম, মংলা এবং মাতারবাড়ি বন্দরগুলো দেশের প্রধান সমুদ্রবন্দর হিসেবে কাজ করে, যা পশ্চিম, মধ্যপ্রাচ্য, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া এবং অন্যান্য গন্তব্যের সঙ্গে সরাসরি সংযোগ স্থাপন করে।
এই বন্দরগুলোতে তেল, রাসায়নিক, যন্ত্রপাতি, ভোক্তা পণ্য ইত্যাদি মূল আমদানি পণ্য এবং কৃষি পণ্য, টেক্সটাইল ও পোশাকের রপ্তানি প্রবাহ ঘটে। বিশেষ করে পোশাক শিল্প দেশের মোট রপ্তানি আয়ের প্রায় ৮০ শতাংশ দখল করে, যা বন্দর কার্যক্রমের গুরুত্বকে আরও বাড়িয়ে দেয়।
বাংলাদেশের দুটি প্রধান সি লাইন অব কমিউনিকেশন (SLOC) রয়েছে; একটি দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দিকে এবং অন্যটি মধ্যপ্রাচ্যের দিকে, যা জ্বালানি ও অপরিহার্য পণ্যের ধারাবাহিক সরবরাহ নিশ্চিত করে। এই সি লাইনগুলো দেশের অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা ও বিকাশের জন্য অপরিহার্য রক্তনালীর মতো কাজ করে।
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বন্দরগুলোর কার্যক্ষমতা, পরিচালন ক্ষমতা এবং সামগ্রিক পারফরম্যান্সে উল্লেখযোগ্য উন্নতি দেখা গেছে। আধুনিকীকরণ প্রকল্প, অবকাঠামো উন্নয়ন এবং সেবা মানের উন্নতির মাধ্যমে কন্টেইনার ও কার্গো প্রবাহের বৃদ্ধি সম্ভব হয়েছে।
বন্দর নেটওয়ার্কের ধারাবাহিক সম্প্রসারণ এবং জাতীয় পরিবহন ও লজিস্টিক্স সিস্টেমের সঙ্গে সংযোগের উন্নতি বাণিজ্যিক লেনদেনের গতি ত্বরান্বিত করেছে। এই উন্নয়নগুলো বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণ, রপ্তানি বৃদ্ধি এবং দেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক প্রতিযোগিতা শক্তিশালী করার সম্ভাবনা তৈরি করেছে।
তবে, সমুদ্র নীতি এখনো সম্পূর্ণভাবে সংহত নয়; নীতি গঠনে স্পষ্টতা ও সমন্বয় না থাকলে বন্দর ব্যবস্থাপনা, নিরাপত্তা এবং পরিবেশগত চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় বাধা সৃষ্টি হতে পারে। আন্তর্জাতিক শিপিং রুটে প্রতিযোগিতা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে দক্ষতা ও টেকসইতা নিশ্চিত করা জরুরি।
আবহাওয়া পরিবর্তন, সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি এবং প্রাকৃতিক দুর্যোগের ঝুঁকি বন্দর অবকাঠামোর জন্য দীর্ঘমেয়াদী হুমকি তৈরি করে। তাই, সমন্বিত সামুদ্রিক নীতি, অবকাঠামো রক্ষণাবেক্ষণ এবং ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা পরিকল্পনা একসাথে গড়ে তোলা প্রয়োজন।
সংক্ষেপে, বাংলাদেশের সমুদ্রসীমা ও বন্দর নেটওয়ার্কের উন্নয়ন দেশের বাণিজ্যিক প্রবাহকে ত্বরান্বিত করে, বিনিয়োগের আকর্ষণ বাড়ায় এবং রপ্তানি ভিত্তিক শিল্পকে সমর্থন করে। তবে, নীতিগত সংহতি, পরিবেশগত সুরক্ষা এবং প্রযুক্তিগত আপডেট না হলে ভবিষ্যতে প্রতিযোগিতামূলক সুবিধা হারানোর ঝুঁকি রয়ে যায়।



