ওয়াশিংটন ডি.সিতে আজ জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা ড. খালিলুর রহমান মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। আলোচনার মূল বিষয় ছিল আসন্ন জাতীয় নির্বাচন, দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য, গাজা অঞ্চলের স্থিতিশীলতা এবং রোহিঙ্গা সংকট। এই মিটিংটি দু’টি পৃথক সেশনে ভাগ করা হয়; প্রথমে তিনি রাজনৈতিক বিষয়ক অধিনায়ক অ্যালিসন হুকারের সঙ্গে, পরে সহকারী রাষ্ট্রদূত পল কাপুরের সঙ্গে কথা বলেন।
ড. খালিলুর হুকারের সঙ্গে বৈঠকে গৃহীত নির্বাচনের প্রস্তুতি সম্পর্কে বিস্তারিত জানিয়ে দেন। তিনি মধ্যস্থ সরকারকে যুক্তরাষ্ট্রের নির্বাচনী সহায়তার জন্য কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন এবং স্বচ্ছ, মুক্ত ও ন্যায়সঙ্গত নির্বাচন নিশ্চিত করার জন্য প্রয়োজনীয় সহায়তা চেয়ে জানান। হুকার এই বিষয়টি স্বীকার করে বলেন যে যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশে গণতান্ত্রিক রূপান্তরকে দৃঢ়ভাবে সমর্থন করে এবং ফেব্রুয়ারি মাসে অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া নির্বাচনের সফলতা প্রত্যাশা করে।
গাজা অঞ্চলের সাম্প্রতিক সংঘাতের পর শান্তি রক্ষার জন্য আন্তর্জাতিক স্থিতিশীলতা বাহিনীর প্রস্তাব নিয়ে কথোপকথন চালানো হয়। ড. খালিলুর বাংলাদেশকে এই উদ্যোগে অংশগ্রহণের ইচ্ছা প্রকাশ করেন, যদিও তা এখনও নীতিগত স্তরে রয়েছে। হুকার এ বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের সহযোগিতার ইচ্ছা প্রকাশ করেন এবং ভবিষ্যতে যৌথ কাজের সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা করেন।
এই প্রস্তাবের পটভূমি হল গত নভেম্বর মাসে জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদে গৃহীত একটি রেজল্যুশন, যা যুক্তরাষ্ট্রের স্পনসর করা এবং ডোনাল্ড ট্রাম্পের ২০‑পয়েন্ট পরিকল্পনাকে সমর্থন করে। রেজল্যুশনের একটি মূল ধারা আন্তর্জাতিক স্থিতিশীলতা বাহিনীর গঠন ও গাজা অঞ্চলে সশস্ত্র শান্তি রক্ষার দায়িত্ব নির্ধারণ করে।
বাণিজ্যিক দিক থেকে ড. খালিলুর যুক্তরাষ্ট্রের কৃষি পণ্যের বাড়তি আমদানি এবং দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য বৃদ্ধির সম্ভাবনা তুলে ধরেন। তিনি উল্লেখ করেন যে বাংলাদেশ ইতিমধ্যে আমেরিকান শস্য, ফল ও শাকসবজি থেকে উল্লেখযোগ্য পরিমাণে উপকৃত হচ্ছে এবং এই প্রবণতা ভবিষ্যতে আরও বাড়বে। এছাড়া তিনি বাংলাদেশি ব্যবসায়িক ব্যক্তিদের যুক্তরাষ্ট্রে ভ্রমণ সহজ করার জন্য ভিসা বন্ডের শর্ত হ্রাসের অনুরোধ করেন।
বিশেষ করে স্বল্পমেয়াদী B1 ব্যবসা ভিসার ক্ষেত্রে ভিসা বন্ডের প্রয়োজনীয়তা থেকে অব্যাহতি চাওয়া হয়। হুকার এই অনুরোধটি শোনার পর যুক্তরাষ্ট্রের সংশ্লিষ্ট বিভাগকে বিষয়টি ইতিবাচকভাবে বিবেচনা করার কথা জানান। তিনি যুক্তরাষ্ট্রের ভিসা নীতিতে নমনীয়তা আনার মাধ্যমে দু’দেশের বাণিজ্যিক সম্পর্ককে আরও শক্তিশালী করার ইচ্ছা প্রকাশ করেন।
এই মিটিংয়ের ফলস্বরূপ দু’পক্ষের মধ্যে ভবিষ্যৎ সহযোগিতার ভিত্তি দৃঢ় হয়েছে বলে ধারণা করা যায়। নির্বাচনী সহায়তা, গাজা শান্তি প্রক্রিয়া এবং বাণিজ্যিক সুবিধা—এই তিনটি ক্ষেত্রেই পারস্পরিক সমঝোতা ও সমর্থন প্রত্যাশিত। বিশেষ করে ফেব্রুয়ারি মাসে অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া জাতীয় নির্বাচনের স্বচ্ছতা ও ন্যায়সঙ্গততা নিশ্চিত করতে আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষণ ও প্রযুক্তিগত সহায়তা বাড়তে পারে।
গাজা অঞ্চলের স্থিতিশীলতা প্রকল্পে বাংলাদেশি অংশগ্রহণের সম্ভাবনা দু’দেশের কূটনৈতিক সম্পর্ককে নতুন মাত্রা দেবে। যদি আন্তর্জাতিক স্থিতিশীলতা বাহিনীর গঠন ও পরিচালনায় বাংলাদেশ সক্রিয় ভূমিকা পালন করে, তবে তা দেশের আন্তর্জাতিক মঞ্চে অবস্থানকে শক্তিশালী করবে এবং রোহিঙ্গা শরণার্থীদের জন্য অতিরিক্ত সমর্থন নিশ্চিত করতে পারে।
বাণিজ্যিক দৃষ্টিকোণ থেকে যুক্তরাষ্ট্রের কৃষি পণ্যের চাহিদা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বাংলাদেশি রপ্তানির পরিমাণও বৃদ্ধি পাবে বলে আশা করা যায়। ভিসা নীতির সহজীকরণ ব্যবসায়িক পরিবেশকে উজ্জীবিত করবে, ফলে দু’দেশের মধ্যে বিনিয়োগ ও প্রযুক্তি স্থানান্তর দ্রুত হবে।
রাজনৈতিকভাবে, ড. খালিলুর এই উচ্চপর্যায়ের মিটিংটি সরকারকে আন্তর্জাতিক সমর্থন জোরদার করার একটি গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ হিসেবে দেখা হচ্ছে। নির্বাচনের আগে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের স্বীকৃতি ও সহায়তা পাওয়া সরকারকে অভ্যন্তরীণ চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় আত্মবিশ্বাস দেবে।
অন্যদিকে, যুক্তরাষ্ট্রের এই ধরনের সমর্থন দেশীয় বিরোধী গোষ্ঠীর জন্য সমালোচনার বিষয় হতে পারে, তবে সরকারী দৃষ্টিকোণ থেকে এটি আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি ও সহযোগিতার সূচক হিসেবে বিবেচিত হবে।
মিটিংয়ের পর ড. খালিলুর চূড়ান্ত বিবৃতি অনুযায়ী, বাংলাদেশ গৃহীত সিদ্ধান্তগুলোকে দ্রুত বাস্তবায়ন করে দু’দেশের পারস্পরিক স্বার্থ রক্ষা করবে। তিনি উল্লেখ করেন যে ভবিষ্যতে নিয়মিত সংলাপের মাধ্যমে দ্বিপাক্ষিক সহযোগিতা আরও গভীর হবে।
এই সাক্ষাৎকারের মাধ্যমে উভয় পক্ষই স্বচ্ছ, ন্যায়সঙ্গত এবং সমন্বিত নীতি অনুসরণে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ হয়েছে। গাজা শান্তি, রোহিঙ্গা সংকট এবং বাণিজ্যিক উন্নয়ন—এই তিনটি অগ্রাধিকারকে একসাথে সমাধান করার প্রচেষ্টা দু’দেশের কূটনৈতিক সম্পর্ককে নতুন উচ্চতায় নিয়ে যাবে।
অবশেষে, ড. খালিলুর এবং যুক্তরাষ্ট্রের কর্মকর্তাদের এই মিটিংটি বাংলাদেশের আসন্ন নির্বাচনের প্রস্তুতি, আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা ও বাণিজ্যিক উন্নয়নের ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে। ভবিষ্যতে আরও উচ্চপর্যায়ের আলোচনার মাধ্যমে এই বিষয়গুলোকে বাস্তবায়নের পথ সুগম হবে।



