ইরানের সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি সম্প্রতি বিক্ষোভকারীদেরকে ‘গোলমালকারী’ বলে উল্লেখ করে বলছেন, তাদের লক্ষ্য যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে সন্তুষ্ট করা। এই মন্তব্যের পরিপ্রেক্ষিতে তেহরান জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদে একটি চিঠি জমা দিয়েছে, যেখানে বিক্ষোভকে যুক্তরাষ্ট্রের প্ররোচনার ফলাফল বলে অভিযোগ করা হয়েছে।
খামেনি এই বক্তব্যের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের নীতি-নির্ধারকদের প্রতি তীব্র সমালোচনা প্রকাশ করেছেন, এবং ইরানের অভ্যন্তরীণ বিষয়গুলোতে বেসামরিক হস্তক্ষেপের বিরুদ্ধে সতর্কতা জোর দিয়েছেন। তিনি উল্লেখ করেন, বিক্ষোভের রূপান্তর ‘সহিংস রাষ্ট্রবিরোধী কর্মকাণ্ড ও বিশাল ধ্বংসে’ রূপান্তরিত হয়েছে, যার দায় তিনি যুক্তরাষ্ট্রের ওপর আরোপ করেন।
জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদে পাঠানো চিঠিতে ইরানের রাষ্ট্রদূত যুক্তরাষ্ট্রকে ‘হুমকি, উসকানি এবং অস্থিতিশীলতা সৃষ্টির জন্য ইচ্ছাকৃত প্ররোচনা’ করার অভিযোগে অভিযুক্ত করেছেন। চিঠিতে বলা হয়েছে, এই প্ররোচনা ইরানের অভ্যন্তরীণ বিষয়গুলোকে অশান্ত করে তুলেছে এবং দেশের নিরাপত্তা ব্যবস্থাকে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে।
অন্যদিকে, যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানের বর্তমান পরিস্থিতিকে ‘বড় বিপদে’ হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। তিনি ইরানের অর্থনৈতিক সংকট ও সামাজিক অশান্তিকে আন্তর্জাতিক নিরাপত্তার হুমকি হিসেবে উল্লেখ করে, যুক্তরাষ্ট্রের পর্যবেক্ষণ বাড়ানোর কথা পুনর্ব্যক্ত করেছেন।
ইরানে চলমান বিক্ষোভের সূচনা অর্থনৈতিক মন্দা ও দারিদ্র্যের বিরুদ্ধে, এবং এখন পর্যন্ত ১৩ দিন অতিক্রান্ত হয়েছে। শিয়া সংখ্যাগরিষ্ঠ এই দেশে এত দীর্ঘ ও বিস্তৃত প্রতিবাদ দেখা যায়নি; বেশ কয়েকটি শহরে প্রতিবাদকারীরা সরকারী নীতির বিরোধিতা করে রাস্তায় নেমে এসেছে।
বিক্ষোভকারীরা মূলত মোল্লাতন্ত্রের উচ্ছেদ এবং রাজতন্ত্রের পুনঃপ্রতিষ্ঠা দাবি করে। কিছু দল সরকারী অর্থনৈতিক নীতি ও বৈদেশিক মুদ্রা নীতির সমালোচনা করে, আর অন্যরা সামাজিক স্বাধীনতা ও মানবাধিকার নিশ্চিত করার দাবি তুলে ধরছে।
মানবাধিকার সংস্থাগুলোর তথ্য অনুযায়ী, এখন পর্যন্ত অন্তত ৪৮ জন বিক্ষোভকারী এবং নিরাপত্তা বাহিনীর ১৪ জন সদস্য প্রাণ হারিয়েছেন। এই সংখ্যায় আহত ও গৃহবন্দী ব্যক্তিরাও অন্তর্ভুক্ত, যদিও সঠিক সংখ্যা এখনও স্পষ্ট নয়।
বিক্ষোভের সময় ইরানের ইন্টারনেট সংযোগ ব্যাপকভাবে বন্ধ করা হয়েছে, যা তথ্যের প্রবাহকে বাধাগ্রস্ত করেছে এবং আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকদের জন্য পরিস্থিতি মূল্যায়ন কঠিন করে তুলেছে।
সেই একই সময়ে, ট্রাম্পের হোয়াইট হাউসের প্রতিনিধিরা উল্লেখ করেন, ইরানের নিরাপত্তা বাহিনীর ওপর ‘শক্তিশালী আঘাত’ করা হবে, তবে তা সরাসরি সৈন্য পাঠের মাধ্যমে নয়। এই মন্তব্যে যুক্তরাষ্ট্রের নীতি-নির্ধারকরা ইরানের অভ্যন্তরীণ বিষয়গুলোতে সরাসরি সামরিক হস্তক্ষেপ না করে, অন্য উপায়ে চাপ বাড়ানোর ইঙ্গিত দেন।
ট্রাম্প পূর্বে রিপাবলিকান পার্টির একজন সদস্যের সঙ্গে আলোচনা করে বলেছিলেন, যদি ইরান সরকার বিক্ষোভকারীদের হত্যা করা শুরু করে, তবে যুক্তরাষ্ট্র কঠোর পদক্ষেপ নেবে। তবে এই সতর্কতা খামেনির বক্তব্যকে তীব্রভাবে প্রত্যাখ্যান করতে ব্যর্থ হয়েছে।
খামেনি টেলিভিশনে সম্প্রচারিত এক ভাষণে জোর দিয়ে বলেন, ইসলামিক প্রজাতন্ত্রের ক্ষমতা ‘কয়েক লাখ সম্মানিত মানুষের রক্তের মাধ্যমে’ অর্জিত হয়েছে, এবং যারা এই ব্যবস্থা বিরোধিতা করে তাদের বিরুদ্ধে কোনো সমঝোতা হবে না। তিনি এই বক্তব্যে ইরানের স্বাধীনতা ও স্বায়ত্তশাসনের প্রতি দৃঢ়তা প্রকাশ করেছেন।
এরপর সমর্থকদের উদ্দেশ্যে তিনি আরও উল্লেখ করেন, ‘ধ্বংসাত্মক উপাদানকে মোকাবেলায় ইরান পিছিয়ে থাকবে না’। এই মন্তব্য রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে প্রচারিত হয় এবং দেশের অভ্যন্তরে সরকারী অবস্থানকে শক্তিশালী করার লক্ষ্যে ব্যবহার করা হয়।
জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের কাছে প্রেরিত চিঠিতে যুক্তরাষ্ট্রের ‘উদ্দেশ্যমূলক প্ররোচনা’ এবং ‘হুমকি’ ইরানের অভ্যন্তরীণ অস্থিরতায় ভূমিকা রাখার অভিযোগ তুলে ধরা হয়েছে। চিঠিতে বলা হয়েছে, এই ধরনের হস্তক্ষেপ আন্তর্জাতিক আইনের লঙ্ঘন এবং ইরানের সার্বভৌমত্বের প্রতি আঘাত।
এই ঘটনাগুলোর পরিপ্রেক্ষিতে ইরানের রাজনৈতিক পরিবেশে নতুন উত্তেজনা দেখা দিচ্ছে। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের দৃষ্টিতে যুক্তরাষ্ট্রের মন্তব্য এবং ইরানের নেতাদের রক্ষণশীল প্রতিক্রিয়া উভয়ই অঞ্চলের স্থিতিশীলতার জন্য গুরুত্বপূর্ণ সূচক হয়ে উঠেছে। ভবিষ্যতে নিরাপত্তা পরিষদের আলোচনায় এই বিষয়গুলো কীভাবে বিবেচিত হবে এবং যুক্তরাষ্ট্রের নীতি কীভাবে পরিবর্তিত হবে, তা ইরানের অভ্যন্তরীণ গতি-প্রকৃতিকে প্রভাবিত করবে।
বিক্ষোভের ধারাবাহিকতা, মৃত্যুর সংখ্যা এবং আন্তর্জাতিক চাপের মিশ্রণে ইরানের সরকার কীভাবে প্রতিক্রিয়া জানাবে, তা দেশের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নির্ধারণে মূল ভূমিকা রাখবে।



