ঢাকা – কেন্দ্রীয় নীতি সংলাপ (সিপিডি) আজ প্রকাশিত স্বতন্ত্র পর্যালোচনায় জানিয়েছে যে, বাংলাদেশ অর্থনীতির বর্তমান অবস্থা বহু‑মুখী ঝুঁকির সম্মুখীন, আর ব্যাংকিং খাত সবচেয়ে বেশি দুর্বল স্তম্ভের মধ্যে একটি। এই বিশ্লেষণটি ২০২৫–২৬ অর্থবছরের প্রথমার্ধের তথ্যের ভিত্তিতে তৈরি, যেখানে সিপিডি সাতটি প্রধান চ্যালেঞ্জ চিহ্নিত করেছে।
প্রথমত, সরকারী ব্যয়কে সমর্থন করার জন্য ব্যাংক ঋণের ওপর নির্ভরতা বৃদ্ধি পেয়েছে, যা আর্থিক স্থিতিশীলতার জন্য হুমকি স্বরূপ। দ্বিতীয়টি হল মুদ্রাস্ফীতি, যা স্বল্পমেয়াদী শক নয়, বরং কাঠামোগত সমস্যার সূচক হিসেবে দেখা হচ্ছে। তৃতীয় চ্যালেঞ্জ হিসেবে খাদ্য নিরাপত্তা সমস্যাকে উল্লেখ করা হয়েছে, যা সরবরাহ শৃঙ্খলের অকার্যকারিতা ও বাজারের বিকৃতি থেকে উদ্ভূত। চতুর্থটি হল বেসরকারি বিনিয়োগের দুর্বলতা, যা উৎপাদনশীলতা ও কর্মসংস্থান বৃদ্ধিকে বাধাগ্রস্ত করছে।
সিপিডি উল্লেখ করেছে যে, বর্তমান অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনার মূল সমস্যাটি হল আর্থিক শৃঙ্খলা পুনঃপ্রতিষ্ঠা করা, একই সঙ্গে অর্থনৈতিক বৃদ্ধি ও সামাজিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখা। এই লক্ষ্য অর্জনের জন্য রাজস্ব নীতি কঠোরভাবে অনুসরণ করা এবং ব্যয় ব্যবস্থাপনা স্বচ্ছ করা অপরিহার্য।
জাতীয় নির্বাচনের পূর্বে, যা ১২ ফেব্রুয়ারি নির্ধারিত, দেশটি একটি গুরুত্বপূর্ণ মোড়ে পৌঁছেছে। সিপিডি এক্সিকিউটিভ ডিরেক্টর ফাহমিদা খাতুনের মতে, নাগরিকরা নির্বাচনের আগে সামাজিক-অর্থনৈতিক প্রবণতা সম্পর্কে গভীর জ্ঞান অর্জনে আগ্রহী। এই সময়ে তথ্যের স্বচ্ছতা ও নীতি নির্ধারণে জনমতকে অন্তর্ভুক্ত করা দেশের সামগ্রিক স্থিতিশীলতার জন্য গুরুত্বপূর্ণ।
মুদ্রাস্ফীতি সম্পর্কে সিপিডি জোর দিয়েছে যে, শুধুমাত্র মুদ্রা নীতি কঠোর করা সমস্যার সমাধান নয়। মূল সমস্যাগুলি সরবরাহ দিকের অদক্ষতা, বাজারের বিকৃতি এবং প্রতিযোগিতার অভাব থেকে উদ্ভূত, যা দীর্ঘমেয়াদে মূল্যবৃদ্ধি চালিত করে। তাই, খাদ্য সরবরাহ শৃঙ্খলের সংস্কারকে জাতীয় অগ্রাধিকার হিসেবে গৃহীত করা দরকার। খাদ্যমূল্য স্থিতিশীলতা কেবল অর্থনৈতিক প্রয়োজন নয়, সামাজিক ও রাজনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকেও অপরিহার্য।
খাদ্য নিরাপত্তা বিষয়টি কেবল কৃষি খাতের সমস্যার সীমা ছাড়িয়ে, একটি সমগ্র ম্যাক্রোইকোনমিক ও শাসন বিষয় হিসেবে বিবেচিত। সিপিডি উল্লেখ করেছে যে, খাদ্য নিরাপত্তা সামাজিক সুরক্ষা, রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা এবং দারিদ্র্য হ্রাসের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত। তাই, কৃষি উৎপাদন, গুদামজাতকরণ এবং বিতরণ ব্যবস্থার সমন্বিত সংস্কার প্রয়োজন, যাতে বাজারে সরবরাহের ঘাটতি দূর হয় এবং মূল্য স্থিতিশীল থাকে।
ব্যাংকিং খাতের সমস্যার সমাধানে সিপিডি দ্রুত আইনগত সংস্কার প্রয়োগের আহ্বান জানিয়েছে। ঋণ নীতি, ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা এবং তহবিলের স্বচ্ছতা বাড়াতে সংশ্লিষ্ট বিধিমালার ত্বরান্বিত বাস্তবায়ন জরুরি। এছাড়া, আর্থিক সংস্থার শাসন কাঠামো শক্তিশালী করা এবং দুর্বল সম্পদ গুণগত মান উন্নত করা দরকার, যাতে ব্যাংকিং সিস্টেমের সামগ্রিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিত হয়।
সিপিডি উপসংহারে উল্লেখ করেছে যে, বর্তমান অর্থনৈতিক পরিবেশে ফিস্কাল শৃঙ্খলা, মুদ্রা নীতি, খাদ্য সরবরাহ এবং ব্যাংকিং সংস্কার একসাথে সমন্বিতভাবে কাজ না করলে দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়ন ধীর হয়ে যাবে। নির্বাচনের আগে এই সংস্কারগুলোকে অগ্রাধিকার দিয়ে বাস্তবায়ন করা হলে, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি বজায় রাখা এবং সামাজিক অস্থিরতা কমানো সম্ভব হবে।
অর্থনৈতিক বিশ্লেষকরা অনুমান করছেন যে, যদি এই চ্যালেঞ্জগুলো সমাধান না করা হয়, তবে মুদ্রাস্ফীতি উচ্চ স্তরে স্থায়ী হতে পারে, যা ভোক্তা ব্যয় ও বিনিয়োগের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে। একই সঙ্গে, ব্যাংকিং খাতের দুর্বলতা আর্থিক সংকটের ঝুঁকি বাড়াতে পারে, যা সরাসরি উৎপাদন ও রপ্তানি খাতে প্রভাব ফেলবে।
সিপিডি কর্তৃক উল্লিখিত সাতটি চ্যালেঞ্জের মধ্যে, খাদ্য নিরাপত্তা ও ব্যাংকিং সংস্কারকে অগ্রাধিকার দিয়ে নীতি নির্ধারণ করা হলে, দেশের অর্থনৈতিক ভিত্তি শক্তিশালী হবে এবং নির্বাচনের পরবর্তী সময়ে স্থিতিশীলতা বজায় থাকবে। এই দৃষ্টিকোণ থেকে, সরকার ও সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়া দেশের দীর্ঘমেয়াদী সমৃদ্ধির জন্য অপরিহার্য।



