আইসিটি বিভাগ ৮ জানুয়ারি তার অফিসিয়াল ওয়েবসাইটে শ্বেতপত্র প্রকাশ করে, যেখানে ‘শেখ রাসেল ডিজিটাল ল্যাব (এসআরডিএল)’ এবং ‘স্কুল অব ফিউচার (এসওএফ)’ প্রকল্পের আর্থিক ও কার্যকরী দুর্নীতি উন্মোচিত হয়েছে। শ্বেতপত্রে উল্লেখ করা হয়েছে, ২০১৫ থেকে ২০১৯ পর্যন্ত এই দুই প্রকল্পে মোট ২৯৮ কোটি ৯৮ লাখ টাকা বরাদ্দ করা হয়, আর ২০১৯ থেকে ২০২৫ পর্যন্ত অতিরিক্ত ৬০৫ কোটি টাকা অনুমোদিত হয়েছে, মোট প্রায় ৯০৩ কোটি টাকার বাজেট।
প্রকল্পের মূল উদ্দেশ্য ছিল ডিজিটাল ল্যাব স্থাপন এবং আধুনিক শিক্ষার জন্য লার্নিং ম্যানেজমেন্ট সিস্টেম (এলএমএস) চালু করা, তবে শ্বেতপত্রে বলা হয়েছে যে এসআরডিএল প্রকল্পটি ‘শিক্ষা ছাড়া ল্যাব’ হিসেবে রূপান্তরিত হয়েছে। ২০০৯ থেকে ২০২৪ শাসনকালের আইসিটি প্রকল্পগুলোর মধ্যে এটিকেই সবচেয়ে বেশি রাজনৈতিক রঙে রাঙানো হয়েছে, যেখানে দলীয় ব্র্যান্ডিংকে মানবসম্পদ উন্নয়নের চেয়ে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে।
শ্বেতপত্রের তথ্যসূত্রে ডিপিপি, আইএমইডি ও আইআইএফসি মূল্যায়ন, মাঠ জরিপ এবং সাক্ষাৎকার অন্তর্ভুক্ত। এসব ভিত্তিতে পুরো প্রকল্পচক্রে শাসনব্যবস্থা, তহবিলের ব্যবহার এবং বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে ধারাবাহিক ব্যর্থতা চিত্রিত হয়েছে। বিশেষ করে, ল্যাবের প্রকৃত ব্যবহার, শিক্ষার্থীর অংশগ্রহণ এবং প্রযুক্তিগত অবকাঠামোর কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন তোলা হয়েছে।
২০২১ সালে শেখ হাসিনা সরকারের অধীনে ‘স্কুল অব ফিউচার’ নামে একটি উপ-প্রোগ্রাম চালু করা হয়, যার লক্ষ্য ছিল ৩০০টি সংসদীয় আসনের প্রতিটিতে একটি করে স্কুলে আধুনিক এডটেক অবকাঠামো স্থাপন করা। এই উদ্যোগের নামকরণ করা হয়েছিল শেখ রাসেল, শেখ মুজিবুর রহমানের কনিষ্ঠ পুত্রের নামে, যা রাজনৈতিক ঐতিহ্যকে শক্তিশালী করার একটি কৌশল হিসেবে ব্যাখ্যা করা হয়। প্রকল্পের অংশ হিসেবে শেখ রাসেল দিবস, শেখ রাসেল পদক এবং শেখ রাসেল অ্যানিমেশন ল্যাবের মতো বিভিন্ন কার্যক্রম চালু করা হয়।
সরকারের দাবি অনুযায়ী, ২০২৩ সাল পর্যন্ত দেশে ১৩,০০০টির বেশি ডিজিটাল ল্যাব স্থাপন করা হয়েছে এবং ২০২৫ সালের মধ্যে আরও ২৭,০০০ ল্যাব যোগ করার পরিকল্পনা রয়েছে। তবে শ্বেতপত্রে এই সংখ্যাগুলোর বাস্তবতা নিয়ে সন্দেহ উত্থাপিত হয়েছে, কারণ ল্যাবের ব্যবহারিক অবস্থা, রক্ষণাবেক্ষণ এবং শিক্ষার্থীর অংশগ্রহণের তথ্য যথাযথভাবে নথিভুক্ত করা হয়নি।
প্রতিপক্ষের দৃষ্টিকোণ থেকে, সরকার এই প্রকল্পকে দেশের ডিজিটাল শিক্ষা উন্নয়নের একটি মাইলফলক হিসেবে উপস্থাপন করেছে এবং রাজনৈতিক ব্র্যান্ডিংকে জাতীয় উন্নয়নের অংশ হিসেবে তুলে ধরেছে। তবে শ্বেতপত্রে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, প্রকল্পের বাস্তবায়নে পর্যাপ্ত তদারকি, স্বচ্ছতা এবং ফলাফলমুখী মূল্যায়নের অভাব রয়েছে।
আইসিটি শ্বেতপত্রের প্রকাশের পর, সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও বিভাগগুলোকে তহবিলের ব্যবহার, প্রকল্পের অগ্রগতি এবং ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা সম্পর্কে বিস্তারিত ব্যাখ্যা দিতে বলা হয়েছে। বিশ্লেষকরা ইঙ্গিত করছেন, যদি প্রকল্পের কাঠামোগত দুর্বলতা এবং রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ দূর করা না যায়, তবে আগামী বছরগুলোতে ডিজিটাল শিক্ষা নীতির কার্যকারিতা আরও ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
এই বিষয়টি দেশের রাজনৈতিক পরিবেশে নতুন আলোড়ন সৃষ্টি করেছে, বিশেষ করে যখন সরকার এবং বিরোধী দলগুলো প্রকল্পের সাফল্য ও ব্যর্থতা নিয়ে ভিন্নমত পোষণ করে। শ্বেতপত্রের ভিত্তিতে, আইসিটি বিভাগ ভবিষ্যতে প্রকল্পের তদারকি শক্তিশালী করতে, স্বচ্ছতা বাড়াতে এবং রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ কমাতে নীতি নির্ধারণের প্রস্তাব দেবে বলে আশা করা হচ্ছে।
প্রকল্পের ভবিষ্যৎ দিকনির্দেশনা এখনো অনিশ্চিত, তবে শ্বেতপত্রের প্রকাশের ফলে সরকারকে তহবিলের ব্যবহার, প্রকল্পের বাস্তবায়ন এবং ফলাফল সম্পর্কে জনসাধারণের সামনে স্পষ্টতা বজায় রাখতে হবে। এই প্রক্রিয়া যদি সঠিকভাবে পরিচালিত হয়, তবে ডিজিটাল ল্যাব ও এডটেক অবকাঠামোর প্রকৃত লক্ষ্য—শিক্ষার্থীদের মানসম্পন্ন শিক্ষা প্রদান—সফলভাবে অর্জন করা সম্ভব হবে।



