বাংলাদেশের ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের এক সপ্তাহ আগে, টোকিওতে ৬ ফেব্রুয়ারি জাপানের সঙ্গে অর্থনৈতিক অংশীদারিত্ব চুক্তি (ইপিএ) স্বাক্ষরের প্রস্তুতি চলছে। বাণিজ্য উপদেষ্টা শেখ বশিরউদ্দীন এবং বাণিজ্য সচিব মাহবুবুর রহমান উভয়ই এই অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণের কথা জানিয়েছেন।
বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে ভুটানের সঙ্গে প্রাধান্য বাণিজ্য চুক্তি (পিটিএ) ছাড়া বাংলাদেশের কোনো দ্বিপাক্ষিক অর্থনৈতিক বা বাণিজ্য চুক্তি নেই। জাপানের সঙ্গে ইপিএ স্বাক্ষর দেশের জন্য নতুন দিগন্ত উন্মোচনের সূচনা হবে।
সরকারের দৃষ্টিতে, এই চুক্তি শুধুমাত্র পণ্য বাণিজ্য নয়, বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান ক্ষেত্রেও নতুন সম্ভাবনা তৈরি করবে। জাপানকে প্রধান বাজারে রূপান্তরিত করার মাধ্যমে ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও যুক্তরাষ্ট্রের ওপর নির্ভরতা কমার প্রত্যাশা করা হচ্ছে।
বিশেষজ্ঞরা ইপিএর সম্ভাব্য সুবিধা স্বীকার করার পাশাপাশি কিছু ঝুঁকির কথাও উল্লেখ করেছেন। বিশেষ করে, বাংলাদেশের এলডিসি (কম উন্নত দেশ) তালিকা থেকে ২০২৬ সালে উত্তরণের পর শুল্ক সুবিধা হ্রাস পেতে পারে, যা দীর্ঘমেয়াদে বাজার প্রবেশে প্রভাব ফেলতে পারে।
ইপিএ উদ্যোগটি ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে গৃহীত হয়। দর-কষাকষির ভিত্তি গড়ে তোলার জন্য একটি যৌথ গবেষণা দল গঠন করা হয় এবং ২০২৩ সালের ২৭ ডিসেম্বর প্রকাশিত প্রতিবেদনে ১৭টি সেক্টরকে আলোচনার অগ্রাধিকার হিসেবে চিহ্নিত করা হয়।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, এই সেক্টরগুলোতে কৃষি, উৎপাদন, তথ্যপ্রযুক্তি, স্বাস্থ্যসেবা এবং অবকাঠামোসহ বিভিন্ন ক্ষেত্র অন্তর্ভুক্ত। এই ভিত্তিতে পরবর্তী আলোচনার কাঠামো নির্ধারিত হয়েছে।
ইপিএকে বাংলাদেশের এলডিসি উত্তরণকে টেকসই করার একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হচ্ছে। চুক্তির আওতায় শুল্ক ও অশুল্ক বাধা হ্রাস, আমদানি কোটা সমন্বয়, পণ্য ও সেবা বাণিজ্য সম্প্রসারণ এবং বিনিয়োগ সহযোগিতার কাঠামো তৈরি করা হবে।
বাণিজ্য সচিব মাহবুবুর রহমান উল্লেখ করেছেন, জাপানের সঙ্গে ইপিএ স্বাক্ষরের মাধ্যমে জাপানে বাংলাদেশি শ্রমিকদের জন্য সেবা খাতের প্রবেশদ্বার খুলে যাবে। এদিকে, বাণিজ্য ও বিনিয়োগ সুবিধা অর্জনের পাশাপাশি সেবা খাতের উন্মুক্ততা দেশের অর্থনৈতিক কাঠামোকে বৈচিত্র্যপূর্ণ করবে।
ইপিএ স্বাক্ষরের পর, জাপান ও বাংলাদেশ উভয়ই পারস্পরিক শুল্ক হ্রাসের মাধ্যমে পণ্য রপ্তানি-আমদানি বৃদ্ধি করতে পারবে। বিশেষ করে, জাপানের উচ্চ প্রযুক্তি পণ্য ও যন্ত্রপাতি বাংলাদেশে প্রবেশের সম্ভাবনা বাড়বে, আর বাংলাদেশি টেক্সটাইল ও কৃষি পণ্য জাপানের বাজারে প্রতিযোগিতা করতে পারবে।
বিনিয়োগের দিক থেকে, জাপানি কোম্পানিগুলোর জন্য বাংলাদেশে সরাসরি বিনিয়োগের শর্ত সহজ হবে বলে আশা করা হচ্ছে। এদিকে, বাংলাদেশি উদ্যোক্তাদের জন্য জাপানের আর্থিক ও প্রযুক্তিগত সহায়তা পাওয়ার সুযোগ বাড়বে।
দীর্ঘমেয়াদে, ইপিএর মাধ্যমে সেবা খাতের উন্মুক্ততা দেশের মোট দেশীয় উৎপাদনে (জিডিপি) অবদান বাড়াতে পারে। তবে, শুল্ক সুবিধার হ্রাস এবং আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতার তীব্রতা বাড়ার ফলে কিছু শিল্পে চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হতে পারে।
সারসংক্ষেপে, জাপানের সঙ্গে ইপিএ স্বাক্ষর বাংলাদেশের বাণিজ্য, বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান ক্ষেত্রে নতুন সম্ভাবনা সৃষ্টি করবে, তবে বাজার প্রবেশের শর্ত ও প্রতিযোগিতার পরিবর্তনকে সতর্কতার সঙ্গে মোকাবেলা করা প্রয়োজন।



