জামালপুরের বকশীগঞ্জে নঈম মিয়ার হাটে শতবর্ষের ঐতিহ্যবাহী মহিষের টক দই বিক্রির একটি বিশেষ বাজার গড়ে উঠেছে। এই বাজারে স্থানীয় কৃষক ও বিক্রেতারা সরাসরি ভোক্তাদের সামনে দই বিক্রি করেন, যেখানে দাম প্রতি কেজি ১৬০ থেকে ১৮০ টাকা পর্যন্ত নির্ধারিত।
হাটটি উপজেলা শহর থেকে প্রায় সাত কিলোমিটার দূরে অবস্থিত, এবং বৃহৎ বটগাছের ছায়ায় গঠিত। বটগাছের নিচে মাটির হাঁড়িতে দই রাখা হয়, যেখানে ক্রেতারা প্লাস্টিকের বয়াম বা বিভিন্ন আকারের পাত্র নিয়ে আসেন। বিক্রেতা ও ক্রেতা সকল বয়সের, যুবক থেকে বৃদ্ধ পর্যন্ত, একত্রে এই ঐতিহ্যবাহী পণ্যটি উপভোগ করেন।
দোকানদাররা প্রতি সপ্তাহে শুধুমাত্র শনিবার ও মঙ্গলবার বিক্রয় চালান, দুপুর ১২টা থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত। এই দুই দিনই হাটের প্রধান কার্যদিবস, যেখানে স্থানীয় ও পার্শ্ববর্তী জেলা শহরের মানুষজন দই কিনতে আসেন। হাটের পূর্ব দিকের ঈদগাহ মাঠের বিশাল বটগাছের ছায়া এই কার্যক্রমকে স্বাভাবিকভাবে শীতল রাখে।
মহিষের টক দই তৈরির পদ্ধতি সম্পূর্ণ প্রাকৃতিক। প্রথমে মহিষের তাজা দুধ সংগ্রহ করে পরিষ্কার মাটির হাঁড়িতে ঢেলে ঢাকনা দিয়ে তিন দিন রেখে দেওয়া হয়। তাপমাত্রা ও কৃত্রিম উপাদানের হস্তক্ষেপ ছাড়া দুধ স্বয়ংক্রিয়ভাবে জমে দইতে রূপান্তরিত হয়। এই প্রক্রিয়ায় কোনো দই বীজ বা অতিরিক্ত তাপ প্রয়োগের প্রয়োজন হয় না, ফলে দইয়ের স্বাদ ও গুণমান অক্ষুণ্ণ থাকে।
প্রতিটি মাটির হাঁড়িতে ২ থেকে ১৫ কেজি পর্যন্ত দই তৈরি করা যায়, এবং এক কেজি দই উৎপাদনের জন্য প্রায় এক লিটারের বেশি দুধের প্রয়োজন হয়। একটি মহিষ থেকে দৈনিক ৪ থেকে ১০ লিটার দুধ সংগ্রহ করা সম্ভব, যা হাটের বিক্রয় চাহিদা পূরণে যথেষ্ট। দইয়ের ঘনত্ব ও উচ্চ ফ্যাটের কারণে এটি এক সপ্তাহ পর্যন্ত তাজা থাকে, ফলে বিক্রেতারা দীর্ঘ সময়ের জন্য স্টক রাখতে পারেন।
বাজারের মূলধন কাঠামো তুলনামূলকভাবে সহজ। দই তৈরির জন্য দরকারি উপকরণ কেবল দুধ ও মাটির হাঁড়ি, এবং কোনো রসায়নিক বা যন্ত্রপাতি ব্যবহার করা হয় না। ফলে উৎপাদন খরচ কম, এবং বিক্রেতারা সরাসরি দুধের ক্রয়মূল্য ও দইয়ের বিক্রয়মূল্যের পার্থক্য থেকে মুনাফা অর্জন করেন। বর্তমান বাজারমূল্য অনুযায়ী, প্রতি কেজি দইয়ের বিক্রয়মূল্য ১৬০-১৮০ টাকা, যা স্থানীয় গ্রাহকদের জন্য সাশ্রয়ী এবং বিক্রেতাদের জন্য যথেষ্ট লাভজনক।
হাটের গ্রাহক গোষ্ঠী মূলত স্থানীয় বাসিন্দা, তবে পার্শ্ববর্তী উপজেলা ও জেলা শহরের মানুষজনও নিয়মিতভাবে এখানে আসেন। দইয়ের স্বাদ, প্রাকৃতিক উৎপাদন পদ্ধতি এবং ঐতিহ্যবাহী ব্র্যান্ডিংয়ের কারণে এটি শহুরে বাজারে প্রতিযোগিতামূলক সুবিধা পায়। এছাড়া, টক দইয়ের স্বাস্থ্যের উপকারিতা ও উচ্চ পুষ্টিগুণের কারণে স্বাস্থ্য সচেতন গ্রাহকদের কাছেও জনপ্রিয়তা বাড়ছে।
বাজারের প্রধান চ্যালেঞ্জগুলো হল মৌসুমী দুধের সরবরাহের অস্থিরতা এবং আধুনিক প্যাকেজিং ও সংরক্ষণ সুবিধার অভাব। দুধের উৎপাদন শীতকালে বেশি, গরমকালে কমে যায়, যা দইয়ের উৎপাদন পরিমাণে প্রভাব ফেলে। তাছাড়া, মাটির হাঁড়িতে দই সংরক্ষণে পরিবেশগত শর্তের উপর নির্ভরতা থাকায় দীর্ঘ দূরত্বে পরিবহন বা রপ্তানির ক্ষেত্রে সীমাবদ্ধতা দেখা দেয়।
ভবিষ্যৎ দৃষ্টিকোণ থেকে, এই ঐতিহ্যবাহী পণ্যের ব্র্যান্ডিং ও মানসম্পন্ন প্যাকেজিং উন্নয়ন করলে বৃহত্তর বাজারে প্রবেশের সম্ভাবনা তৈরি হবে। সরকারী বা বেসরকারি সংস্থার সহায়তায় প্রশিক্ষণ, গুণগত মান নিশ্চিতকরণ ও বিপণন কৌশল গড়ে তোলা হলে উৎপাদন বাড়িয়ে রপ্তানি সম্ভাবনাও উন্মুক্ত হবে। এছাড়া, পর্যটন সংযোগের মাধ্যমে হাটকে সাংস্কৃতিক পর্যটন গন্তব্যে রূপান্তরিত করা যায়, যা স্থানীয় অর্থনীতিতে অতিরিক্ত আয় যোগাবে।
সারসংক্ষেপে, নঈম মিয়ার হাটের শতবর্ষী মহিষের টক দই বাজার স্বল্প মূলধনে উচ্চ মুনাফা অর্জনকারী একটি মডেল। প্রাকৃতিক উৎপাদন পদ্ধতি, স্থিতিশীল দাম এবং স্থানীয় চাহিদা এই ব্যবসাকে টেকসই করে তুলেছে। তবে সরবরাহের মৌসুমী পরিবর্তন ও আধুনিক সংরক্ষণ সুবিধার অভাব মোকাবিলার জন্য কাঠামোগত সহায়তা ও বাজার সম্প্রসারণের পরিকল্পনা প্রয়োজন, যাতে এই ঐতিহ্যবাহী পণ্যটি ভবিষ্যতে আরও বিস্তৃত অর্থনৈতিক মূল্য অর্জন করতে পারে।



