ঢাকা, বর্তমানে বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম মহানগর, দ্রুত জনসংখ্যা ও বিস্তারে অগ্রসর হচ্ছে; জাতিসংঘের তথ্য অনুযায়ী ২০৫০ সালের মধ্যে এটি বিশ্বের সবচেয়ে জনবহুল শহর হয়ে উঠবে। এই প্রবণতা শহরের অবকাঠামো ও সেবার ওপর বাড়তি চাপে নতুন চ্যালেঞ্জ সৃষ্টি করছে।
জাতিসংঘের পূর্বাভাসে দেখা যায়, আগামী ২৫ বছরে ঢাকা এবং শাংহাই প্রত্যেক বছর গড়ে ৫ শতাংশ হারে জনসংখ্যা বৃদ্ধি পাবে। এই হার দু’শহরের মোট জনসংখ্যা বৃদ্ধিতে সমান অবদান রাখবে, ফলে ঢাকা শীঘ্রই শাংহাইকে ছাড়িয়ে বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় নগরী হবে।
শহরের রাস্তায় শীতের কুয়াশা, হালকা বৃষ্টির ফোঁটা এবং ভেজা শিশিরের দৃশ্য এখনো রূপান্তরিত হয়নি। কাঁঠালবাগানের খালি রাস্তা, বন্ধ দোকান এবং গরম কুয়াশা মিশ্রিত পরিবেশে বাসিন্দারা এখনও লেপ ও কম্বলের নিচে গরমের জন্য সংগ্রাম করছেন।
কাঁঠালবাগানের কালভার্ট এলাকায় বসবাসরত এক গৃহকর্মী, যিনি ত্রিশ পাঁচ বছর আগে জামালপুর থেকে এই বস্তিতে আসেন, তার পরিবার এখনো একই পাড়া থেকে কাজ করে। তিনি অর্ধেক সময়ের গৃহকর্মী এবং তার মেয়েও একই ধরণের কাজ করে বিভিন্ন বাসাবাড়িতে। তাদের দু’জনের সন্তানও বড় হয়ে একই পেশায় যুক্ত হয়েছে, যা শহরের অভ্যন্তরে শ্রমিক শ্রেণীর স্থায়ী উপস্থিতি নির্দেশ করে।
অন্যদিকে, খুলনা জেলার এক গ্রাম থেকে ঢাকা এসে পড়াশোনা শেষ করা এক গৃহকর্তা, এখন বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে কর্মরত এবং এক সন্তানসহ পরিবার গড়ে তুলেছেন। তিনি এবং তার পরিবারও শহরের গৃহকর্মী ও গৃহকর্তা উভয়ের মতোই দীর্ঘ সময়ের জন্য একই পাড়া থেকে জীবনের ভিত্তি গড়ে তুলেছেন।
এই দুই পরিবারের দীর্ঘস্থায়ী উপস্থিতি ঢাকার নগরায়নের একটি চিত্র তুলে ধরে: গ্রামীণ থেকে শহরে আসা মানুষজনের ধারাবাহিক প্রবাহ এবং তাদের স্থায়ী বসতি গঠন। এ ধরনের অভিবাসন ধারাবাহিকভাবে শহরের বিস্তারকে ত্বরান্বিত করেছে, ফলে ঢাকা এখন বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম মহানগর হিসেবে স্বীকৃত।
বৃহত্তরায়নের সঙ্গে সঙ্গে শহরের পরিকল্পনা ও ব্যবস্থাপনা ব্যর্থতা স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। পরিবহন ব্যবস্থা অপর্যাপ্ত, আবাসিক পরিকল্পনা অনুপস্থিত, বিদ্যুৎ, পানি ও গ্যাসের সরবরাহের মান নিম্নমানের। সবুজায়ন, ফুটপাত, শব্দ ও বায়ু দূষণ নিয়ন্ত্রণে কোনো সুস্পষ্ট নীতি দেখা যায় না।
বিশ্বব্যাংকের “টুওয়ার্ড গ্রেট ঢাকা” গ্রন্থের সহলেখক, বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ হোসেন জিল্লুর রহমানের মতে, রাজধানী শহর হওয়া সত্ত্বেও ঢাকার গ্রামীণ স্বাদ এখনও অদৃশ্য নয়। প্রধান সড়কে হাটের উপস্থিতি, অনানুষ্ঠানিক খাতের বিস্তৃতি এবং উৎপাদনশীলতার নিম্ন স্তর শহরের অর্থনৈতিক কাঠামোকে দুর্বল করে তুলছে।
রাজনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে দেখা যায়, শহরের দ্রুত পরিবর্তনের সঙ্গে নীতিনির্ধারকদের পদক্ষেপ সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। পরিকল্পনা ও নীতি প্রণয়নে দেরি, ফলে নগরায়নের সমস্যাগুলি সমাধান করা কঠিন হচ্ছে। আসন্ন নির্বাচনের সময় এই বিষয়গুলোকে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক আলোচনার পরিধি বাড়তে পারে।
শহরের ভবিষ্যৎ উন্নয়নের জন্য অবিলম্বে সমন্বিত নগর পরিকল্পনা, অবকাঠামো উন্নয়ন এবং সেবা মানোন্নয়ন প্রয়োজন। না হলে জনসংখ্যা বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে বাসযোগ্যতার হ্রাস অব্যাহত থাকবে, যা সামাজিক ও অর্থনৈতিক অস্থিরতা বাড়িয়ে তুলবে।
ঢাকার এই বিশাল পরিবর্তন ও চ্যালেঞ্জের মুখে সরকার, নাগরিক সমাজ এবং বেসরকারি সংস্থার সমন্বিত প্রচেষ্টা অপরিহার্য, যাতে শহরটি কেবল বৃহত্তর নয়, বরং বাসযোগ্যও হয়ে ওঠে।



