দক্ষিণ আফ্রিকার নৌবাহিনী সিমন্স টাউন নৌবেসে শুক্রবার থেকে এক সপ্তাহব্যাপী সামুদ্রিক মহড়া শুরু করেছে। এতে চীন, ইরান ও রাশিয়ার নৌযান অংশগ্রহণ করছে, আর এই সময়ে দেশের যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্ক ইতিমধ্যে সর্বনিম্নে পৌঁছেছে।
সাম্প্রতিক দিনগুলোতে চীনা, ইরানি ও রাশিয়ান পতাকাসহ নৌবাহিনীর জাহাজগুলো ক্যাপ পেনিনসুলার সিমন্স টাউনে প্রবেশ করেছে। এই নৌবেস দক্ষিণ আফ্রিকার প্রধান সামুদ্রিক ঘাঁটি, যেখানে আন্তর্জাতিক নৌবাহিনীর সমাবেশের জন্য প্রায়ই প্রশিক্ষণ অনুষ্ঠিত হয়।
মহড়াটি চীনের নেতৃত্বে পরিচালিত হচ্ছে এবং বৃহত্তর উন্নয়নশীল দেশসমূহের একটি গোষ্ঠীর অংশ। ২০০৬ সালে ব্রাজিল, রাশিয়া, ভারত ও চীন একত্রে ব্রিক (BRIC) নামে একটি সংস্থা গঠন করে, যার চার বছর পর দক্ষিণ আফ্রিকা যোগ দিয়ে ব্রিক্স (BRICS) হয়। সাম্প্রতিক সময়ে মিশর, ইথিওপিয়া, ইন্দোনেশিয়া, ইরান ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের সংযোজনের ফলে গোষ্ঠীটি ব্রিক্স+ নামে পরিচিত।
দক্ষিণ আফ্রিকার প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় জানিয়েছে যে, এই সমাবেশের মূল উদ্দেশ্য হল সমন্বিত সামুদ্রিক নিরাপত্তা কার্যক্রম, পারস্পরিক সামরিক সামঞ্জস্যের প্রশিক্ষণ এবং জাহাজ রক্ষার সিরিজ পরিচালনা করা। প্রশিক্ষণের মাধ্যমে বাণিজ্যিক জাহাজের নিরাপত্তা এবং সামুদ্রিক অর্থনৈতিক কার্যক্রমের সুরক্ষা নিশ্চিত করা লক্ষ্য।
অংশগ্রহণকারী দেশগুলোর সুনির্দিষ্ট তালিকা প্রকাশ না করলেও, চীন, ইরান ও রাশিয়ার নৌবাহিনীর উপস্থিতি স্পষ্ট। মন্ত্রণালয় উল্লেখ করেছে যে, প্রশিক্ষণটি সকল অংশগ্রহণকারীকে একত্রে কাজ করার সুযোগ দেবে, তবে কোন দেশগুলো সক্রিয়ভাবে অংশ নেবে তা নির্দিষ্ট করা হয়নি।
যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্কের অবনতি এই মহড়াকে আরও সংবেদনশীল করে তুলেছে। প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের শাসনামলে দক্ষিণ আফ্রিকাকে এই ধরনের সামরিক সমাবেশে যুক্ত করা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে। কিছু প্রতিবেদন ইঙ্গিত করে যে, দক্ষিণ আফ্রিকা ইরানকে পর্যবেক্ষক হিসেবে রাখার চেষ্টা করছে, যাতে যুক্তরাষ্ট্রের সমালোচনা কমে।
ব্রিক্স+ একটি অর্থনৈতিক গোষ্ঠী হলেও সামরিক প্রশিক্ষণে যুক্ত হওয়া নিয়ে প্রশ্ন তোলা হয়েছে। বিশ্লেষকরা উল্লেখ করেন, গোষ্ঠীর সদস্য দেশগুলোর মধ্যে রাজনৈতিক মতপার্থক্য ও সীমান্তসংঘর্ষ বিদ্যমান, যা একসাথে সামরিক অনুশীলনকে জটিল করে তুলতে পারে। একজন প্রতিরক্ষা বিশ্লেষক বলেন, “ব্রিক্স+ এর কিছু সদস্য রাজনৈতিকভাবে একে অপরের সঙ্গে বিরোধপূর্ণ, এমনকি সীমান্তে সংঘর্ষও রয়েছে।” এই মন্তব্য গোষ্ঠীর সামরিক সমন্বয়ের সম্ভাব্য ঝুঁকি তুলে ধরে।
দক্ষিণ আফ্রিকা পূর্বে চীন ও রাশিয়ার সঙ্গে নৌ প্রশিক্ষণ করেছে। প্রথমবারের মতো এই দুই দেশের সঙ্গে যৌথ মহড়া “মোসি” নামে পরিচিত ছিল, যার অর্থ টসোয়ানা ভাষায় “ধোঁয়া”। সেই অভিজ্ঞতা থেকে শিখে এখন দেশের নৌবাহিনী আন্তর্জাতিক সমাবেশে অংশগ্রহণের প্রস্তুতি নিচ্ছে।
ব্রিক্স+ এর সম্প্রসারণ এবং সামরিক প্রশিক্ষণকে পশ্চিমা শক্তির প্রভাবকে চ্যালেঞ্জ করার একটি কৌশল হিসেবে দেখা হচ্ছে। এই মহড়া যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বিদ্যমান কূটনৈতিক উত্তেজনা বাড়িয়ে তুলতে পারে, ফলে ভবিষ্যতে বাণিজ্যিক ও নিরাপত্তা সহযোগিতায় পরিবর্তন আসতে পারে।
মহড়ার পরবর্তী পর্যায়ে অংশগ্রহণকারী দেশগুলোর মধ্যে সমন্বয় বাড়িয়ে আরও দীর্ঘমেয়াদী প্রশিক্ষণ পরিকল্পনা করা হতে পারে। আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকরা এই সমাবেশের ফলাফল এবং তার পরবর্তী কূটনৈতিক প্রভাবের দিকে নজর রাখছেন।



