বছরের পর বছর স্থবিরতা ও অনিশ্চয়তার পর, ছাত্র-জনতার প্রতিবাদ শেষে দেশের অর্থনীতিতে পুনরুজ্জীবনের প্রত্যাশা বাড়ছে। বেসরকারি খাতের ব্যবসায়িক সম্প্রদায় নতুন রাজনৈতিক নেতৃত্বের সম্ভাবনা দেখে আত্মবিশ্বাসী, কারণ তারা বিশ্বাস করে যে স্থিতিশীল সরকারী নীতি বিনিয়োগের পরিবেশকে উন্নত করবে। বিশেষ করে রেমিট্যান্সের ধারাবাহিক প্রবাহ এবং বৈদেশিক মুদ্রা রিজার্ভের স্বস্তি অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারের মূল চালিকাশক্তি হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের নির্বাহী পরিচালক ড. ফাহমিদা খাতুন উল্লেখ করেছেন যে, অন্তর্বর্তী সরকার কিছু গুরুত্বপূর্ণ সংস্কার চালু করলেও তার গতি ধীর ছিল। ব্যাংকিং খাতের সংস্কারকে প্রধান পদক্ষেপ হিসেবে তুলে ধরে তিনি বলেন, এই সংস্কার রেমিট্যান্স ও রপ্তানির বৃদ্ধিতে সহায়তা করেছে এবং বৈদেশিক মুদ্রা রিজার্ভকে শক্তিশালী করেছে, ফলে বড় ধরনের আর্থিক সংকট এড়ানো সম্ভব হয়েছে। তবে তিনি সতর্ক করে জানান, মুদ্রাস্ফীতি এখনও উচ্চ পর্যায়ে রয়েছে এবং বিনিয়োগ, কর্মসংস্থান ও রাজস্ব সংগ্রহে উল্লেখযোগ্য উন্নতি দেখা যায়নি।
বিনিয়োগকারীরা সাধারণত পাঁচ থেকে সাত বছর সময়ের মধ্যে রিটার্ন প্রত্যাশা করেন, তাই তারা রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ও দীর্ঘমেয়াদী নীতি নিশ্চিতকরণকে অগ্রাধিকার দেন। নতুন সরকার গঠন হলে, বিনিয়োগের স্থবিরতা কমে যাবে এবং বেসরকারি খাতে পুনরায় প্রবাহ শুরু হবে বলে আশা করা হচ্ছে। এই দৃষ্টিকোণ থেকে, ব্যবসায়িক উদ্যোক্তারা নতুন সরকারের ওপর উচ্চ প্রত্যাশা রাখছেন, যাতে তারা আর্থিক পরিকল্পনা ও সম্প্রসারণের জন্য প্রয়োজনীয় পরিবেশ পেতে পারে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে ব্যাংকিং চ্যানেলের মাধ্যমে রেমিট্যান্সের মোট পরিমাণ প্রথমবারের মতো ৩২ বিলিয়ন ডলারের সীমা অতিক্রম করেছে। পূর্ববর্তী বছরে প্রবাসীরা ৩২.৮২ বিলিয়ন ডলার পাঠিয়েছিলেন, যা আগের বছরের তুলনায় ২২ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। ২০২৪ সালে রেমিট্যান্সের পরিমাণ ২৬.৮৯ বিলিয়ন ডলার ছিল, ফলে এক বছরে প্রায় ৫.৯ বিলিয়ন ডলার বৃদ্ধি দেখা গেছে। এই ধারাবাহিক বৃদ্ধিই দেশের বৈদেশিক মুদ্রা রিজার্ভে স্বস্তি এনে দিয়েছে এবং মুদ্রা বাজারের অস্থিরতা কমাতে সহায়তা করেছে।
অর্থনীতিবিদরা রেমিট্যান্সকে দেশের অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার অন্যতম প্রধান ভিত্তি হিসেবে মূল্যায়ন করছেন। প্রবাসী আয়ের এই প্রবাহের ধারাবাহিকতা না থাকলে, দেশের বাণিজ্যিক ঘাটতি ও মুদ্রা সংকটের ঝুঁকি বাড়তে পারত। বর্তমানে রেমিট্যান্সের উচ্চ প্রবাহের ফলে বাণিজ্যিক ঘাটতি কমে গেছে এবং মুদ্রা রিজার্ভের পর্যাপ্ততা নিশ্চিত হয়েছে, যা আর্থিক নীতি প্রণয়নে স্বচ্ছতা এনে দিয়েছে।
তবে, রেমিট্যান্সের প্রবাহই একমাত্র সমাধান নয়। ড. ফাহমিদা খাতুনের মতে, দীর্ঘমেয়াদী অর্থনৈতিক উন্নয়নের জন্য বিনিয়োগের পরিবেশকে আরও আকর্ষণীয় করতে নীতি সংস্কার, কর কাঠামোর সরলীকরণ এবং শ্রম বাজারের নমনীয়তা প্রয়োজন। এছাড়া, মূল্যস্ফীতির দমন এবং উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি করা জরুরি, যাতে কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে ত্বরান্বিত হয় এবং রাজস্ব সংগ্রহ বাড়ে।
সারসংক্ষেপে, বেসরকারি খাতে আশা ও উদ্যমের পুনর্জাগরণ নতুন সরকারের গৃহীত নীতি ও স্থিতিশীলতার ওপর নির্ভরশীল। রেমিট্যান্সের ধারাবাহিক বৃদ্ধি এবং বৈদেশিক মুদ্রা রিজার্ভের স্বস্তি ইতিবাচক সংকেত হলেও, বিনিয়োগ, কর্মসংস্থান ও মুদ্রাস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে সুনির্দিষ্ট পদক্ষেপ না নিলে অর্থনীতির পূর্ণ পুনরুদ্ধার কঠিন হবে। তাই, পরবর্তী সরকারকে এই চ্যালেঞ্জগুলোকে অগ্রাধিকার দিয়ে সমন্বিত নীতি প্রণয়ন করতে হবে, যাতে দেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক সূচকগুলো স্থায়ীভাবে উন্নতি করতে পারে।



