স্পেনের চলচ্চিত্র নির্মাতা ডেভিড বাউটে তার নতুন ২ডি অ্যানিমেশন ‘ব্ল্যাক বাটারফ্লাইস’ (Mariposas Negras) নিয়ে আন্তর্জাতিক মঞ্চে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে আছেন। স্পেন ও ল্যাটিন আমেরিকায় ইতিমধ্যে প্রশংসা পেয়ে, এখন এই কাজটি যুক্তরাষ্ট্রের দর্শকদের সামনে উপস্থাপনের পরিকল্পনা চালু করেছে।
বাউটে এই প্রকল্পে দশের বেশি বছর ব্যয় করেছেন; ধারণা থেকে চূড়ান্ত সম্পাদনা পর্যন্ত প্রতিটি ধাপের জন্য দীর্ঘ সময়ের গবেষণা ও অ্যানিমেশন কাজের প্রয়োজন হয়। এই দীর্ঘমেয়াদী প্রচেষ্টা শেষমেশ একটি ১২০ মিনিটের পূর্ণদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্রের রূপ নেয়।
ডেভিড বাউটে আগে থেকেই ডকুমেন্টারি ধারায় কাজ করে আসছেন; তার পূর্বের কাজগুলোর মধ্যে ‘দ্য চিলড্রেন অফ দ্য ক্লাউড’ (২০০০), ‘লা মুর্গা’ (২০১৪) এবং ‘মিলাগ্রোস’ (২০১৭) উল্লেখযোগ্য। এই পটভূমি তাকে বাস্তব ঘটনার ভিত্তিতে গল্প গড়ে তোলার দক্ষতা প্রদান করেছে, যা ‘ব্ল্যাক বাটারফ্লাইস’ এও স্পষ্টভাবে প্রতিফলিত হয়েছে।
চলচ্চিত্রটি ইকিরু ফিল্মসের প্রযোজক এডমন রোচের তত্ত্বাবধানে তৈরি হয়েছে এবং ইয়াইজা বেরোকাল লিখিত চিত্রনাট্য অনুসরণ করে। অ্যানিমেশনের শৈলী ২ডি হাতে আঁকা, যা বাস্তব জীবনের সূক্ষ্মতা ও আবেগকে দৃশ্যমান করে তুলেছে।
কাহিনীর কেন্দ্রে রয়েছে তিনজন নারী, প্রত্যেকেই ভিন্ন মহাদেশের বাস্তব জীবনের অভিজ্ঞতা থেকে অনুপ্রাণিত। তানিত, ভ্যালেরিয়া এবং শাইলা—এই তিন চরিত্রের মাধ্যমে জলবায়ু পরিবর্তনের বৈশ্বিক প্রভাবকে ব্যক্তিগত স্তরে তুলে ধরা হয়েছে।
তানিতের গল্প কেনিয়ার একটি আদিবাসী গোষ্ঠীর সঙ্গে যুক্ত; দীর্ঘস্থায়ী খরার ফলে পানির জন্য গোষ্ঠীর মধ্যে যুদ্ধ ছড়িয়ে পড়ে, যা তার সম্প্রদায়ের ঐতিহ্যকে হুমকির মুখে ফেলে। এই পরিস্থিতিতে তানিতকে তার পরিবারের নিরাপত্তা রক্ষার পাশাপাশি গোষ্ঠীর ঐতিহ্য সংরক্ষণে সংগ্রাম করতে হয়।
ভ্যালেরিয়া সেন্ট মার্টিনে বসবাস করতেন; একটি তীব্র হারিকেন তার পারিবারিক বাড়ি ধ্বংস করে, ফলে তিনি স্বামীকে ছেড়ে অন্যত্র আশ্রয় নিতে বাধ্য হন। হারিকেনের পরিণতি তার জীবনের স্থিতিশীলতা ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনাকে সম্পূর্ণভাবে বদলে দেয়।
শাইলা ভারতের ঘোরামারার একটি ধানক্ষেত্রে বাস করতেন; সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বাড়ার ফলে তার ক্ষেত্রের পানির স্তর বেড়ে যায় এবং চাষের উপযোগী জমি হারিয়ে যায়। অর্থনৈতিক সংকটের মুখে তিনি দুবাইতে কাজের সন্ধান করেন, যেখানে কর্মস্থলে যৌন নির্যাতনের শিকার হন।
চিত্রনাট্যকারের মতে, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবের মুখোমুখি হওয়া প্রধানত নারীরা; তারা প্রাকৃতিক দুর্যোগের সঙ্গে সঙ্গে পরিবার ও বয়স্কদের রক্ষা করার দ্বৈত দায়িত্ব বহন করে। তাই তিনটি ভিন্ন দৃশ্যের মাধ্যমে নারীদের সংগ্রামকে একত্রিত করে একটি সমন্বিত বার্তা পৌঁছে দেওয়া হয়েছে।
স্পেনের চলচ্চিত্র উৎসবে এই কাজটি প্রথমবার প্রদর্শিত হওয়ার পর দর্শক ও সমালোচকদের কাছ থেকে উচ্চ প্রশংসা পায়; বিশেষ করে অ্যানিমেশনের সূক্ষ্মতা ও বাস্তব ঘটনার সংবেদনশীল উপস্থাপনাকে প্রশংসা করা হয়েছে।
ল্যাটিন আমেরিকায়ও চলচ্চিত্রটি বিভিন্ন শহরে প্রদর্শিত হয়েছে; স্থানীয় মিডিয়া এটিকে জলবায়ু সচেতনতা বাড়ানোর একটি গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম হিসেবে উল্লেখ করেছে। এই অঞ্চলের দর্শকরা নারীদের মুখোমুখি চ্যালেঞ্জের সঙ্গে নিজস্ব অভিজ্ঞতা যুক্ত করে গভীরভাবে সংযুক্ত হয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রে মুক্তির জন্য বর্তমানে বিতরণ সংস্থার সঙ্গে আলোচনা চলছে; প্রধান আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবে অংশগ্রহণের পরিকল্পনাও রয়েছে। নির্মাতারা আশা করছেন, এই অ্যানিমেশনটি আমেরিকান দর্শকদের কাছে জলবায়ু পরিবর্তনের মানবিক দিকটি তুলে ধরতে সক্ষম হবে এবং একই সঙ্গে নারীর অধিকার নিয়ে আলোচনার সূচনা করবে।
‘ব্ল্যাক বাটারফ্লাইস’ কেবল একটি চলচ্চিত্র নয়; এটি জলবায়ু সংকটের মুখে নারীর ভূমিকা ও সংগ্রামকে বিশ্বব্যাপী জানার একটি প্রচেষ্টা। দর্শকরা যদি এই কাজটি দেখেন, তবে তারা বাস্তব জীবনের সমস্যার সঙ্গে সংযুক্ত একটি শিল্পকর্মের অভিজ্ঞতা পাবেন এবং পরিবেশ সংরক্ষণের গুরুত্ব পুনর্বিবেচনা করতে পারবেন।



