খুলনা-৫ (ডুমুরিয়া) আসনের আওতায় শুক্রবার (৯ জানুয়ারি) অনুষ্ঠিত এক সমাবেশে জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার হিন্দু সম্প্রদায়ের অধিকার ও নিরাপত্তা সম্পর্কে স্পষ্ট বক্তব্য রাখেন। তিনি উল্লেখ করেন, জামায়াতের ক্ষমতায় আসলে সংখ্যালঘু হিন্দুদের ধর্ম, সংস্কৃতি বা নাগরিক স্বাতন্ত্র্য ক্ষতিগ্রস্ত হবে এমন ধারণা সম্পূর্ণ মিথ্যা এবং বিভ্রান্তিকর।
সমাবেশটি ডুমুরিয়া উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় ‘ওয়ার্ড প্রতিনিধি, সহযোগী সদস্য ও সংখ্যালঘু সদস্য’দের সমন্বয়ে গঠিত একটি বৃহৎ সমাবেশ ছিল, যেখানে স্থানীয় হিন্দু নেতারা, শিক্ষক ও সমাজসেবক উপস্থিত ছিলেন। সমাবেশের প্রধান অতিথি হিসেবে গোলাম পরওয়ারকে স্থানীয় নেতারা স্বাগত জানিয়ে, তাদের উদ্বেগ শোনার সুযোগ দেন।
গোলাম পরওয়ারের মতে, সাম্প্রতিক সময়ে কিছু গোষ্ঠী হিন্দু সম্প্রদায়কে ভয় দেখানোর জন্য পরিকল্পিত প্রচারণা চালাচ্ছে। তারা ভোটের সময় হিন্দুদের ধর্ম পরিবর্তন হবে, মেয়েদের চলাচল সীমাবদ্ধ হবে ইত্যাদি ভুয়া তথ্য ছড়িয়ে দিচ্ছে। তিনি জোর দিয়ে বলেন, এসব দাবি বাস্তবে কোনো ভিত্তি নেই এবং হিন্দুদের দৈনন্দিন জীবনে কোনো প্রভাব ফেলছে না।
তিনি আরও উল্লেখ করেন, জামায়াতের কোনো সদস্য কখনো হিন্দুদের বাড়ি দখল করে না, মিথ্যা মামলা দায়ের করে না, অথবা জমি ও ঘের দখল করে না। এমন অভিযোগের পেছনে যারা আছে, তারা দীর্ঘকাল ধরে রাষ্ট্রক্ষমতায় রয়েছে, যা তিনি ৫৪ বছর হিসেবে উল্লেখ করেন। এই সময়কালে বিভিন্ন সরকারী নীতি ও কর্মকাণ্ডে সংখ্যালঘুদের অধিকার হ্রাসের অভিযোগ উঠেছে, তবে জামায়াতের এই অবস্থানকে তিনি স্বতন্ত্রভাবে তুলে ধরেন।
সমাবেশে উপস্থিত হিন্দু নেতারা, যেমন ডা. নিত্য রঞ্জন রায় (ভান্ডারপাড়া ইউনিয়ন হিন্দু কমিটির সভাপতি) ও ডা. হরিদাস মন্ডল (ডুমুরিয়া উপজেলা হিন্দু কমিটির সভাপতি), উল্লেখ করেন যে তাদের সম্প্রদায়ের প্রধান, শিক্ষক ও অন্যান্য সামাজিক কর্মীরা বর্তমানে স্বাধীনভাবে ধর্মীয় কার্যক্রম চালাচ্ছেন। তারা বলেন, হিন্দু সম্প্রদায়ের ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানগুলো কোনো বাধা ছাড়াই অনুষ্ঠিত হচ্ছে।
গোলাম পরওয়ারের মন্তব্যের সঙ্গে সঙ্গে তিনি হিন্দু সম্প্রদায়ের স্বয়ংসম্পূর্ণতা ও স্বাধীনতা বজায় রাখার গুরুত্বের ওপর জোর দেন। তিনি দাবি করেন, ইসলামের ন্যায়সঙ্গত শাসন প্রতিষ্ঠা হলে হিন্দু-মুসলিম নির্বিশেষে সকলের জীবনে কল্যাণের বীজ বপন হবে। এই দৃষ্টিকোণ থেকে তিনি সকল ধর্মের মানুষের সমান অধিকার নিশ্চিত করার আহ্বান জানান।
সমাবেশে অন্যান্য স্থানীয় নেতারাও কথা বলেন। ইউনিয়ন আমীর মাওলানা কামরুল ইসলাম, ইউনিয়ন সেক্রেটারি মাওলানা আসাদুজ্জামান এবং এডভোকেট অশোক কুমার সিংহ সহ বহু ব্যক্তি তাদের মতামত প্রকাশ করেন। তারা সকলেই হিন্দু ও মুসলিম সম্প্রদায়ের শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানের পক্ষে মত প্রকাশ করেন এবং কোনো ধরনের ধর্মভিত্তিক বৈষম্যকে নিন্দা করেন।
এই সমাবেশটি চলমান রাজনৈতিক পরিবেশের প্রেক্ষাপটে অনুষ্ঠিত হয়। দেশের বিভিন্ন অংশে ধর্মীয় সংবেদনশীলতা নিয়ে আলোচনা বাড়ছে, বিশেষত আসন্ন নির্বাচনের প্রস্তুতি চলাকালীন। জামায়াতের এই ধরনের প্রকাশনা তাদের রাজনৈতিক অবস্থানকে স্পষ্ট করতে এবং সংখ্যালঘু ভোটারদের আস্থা অর্জনে সহায়তা করতে পারে বলে বিশ্লেষকরা অনুমান করছেন।
গোলাম পরওয়ারের বক্তব্যের সঙ্গে সঙ্গে তিনি উল্লেখ করেন, হিন্দু সম্প্রদায়ের নেতারা স্থানীয় প্রশাসনের সঙ্গে সমন্বয় রেখে তাদের অধিকার রক্ষার জন্য কাজ করছেন। তিনি বলেন, কোনো গোষ্ঠী যদি হিন্দুদের বাড়ি দখল বা মিথ্যা মামলা করার চেষ্টা করে, তা অবিলম্বে আইনি পথে মোকাবিলা করা হবে।
এই ধরনের প্রকাশনা জামায়াতের ঐতিহাসিক নীতি ও ধর্মীয় সহনশীলতার দৃষ্টিভঙ্গিকে পুনরায় তুলে ধরার একটি প্রচেষ্টা হিসেবে দেখা হচ্ছে। পূর্বে জামায়াতের কিছু নেতার মন্তব্যে ধর্মীয় সংবেদনশীলতা নিয়ে বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে; তবে বর্তমান সময়ে এই ধরণের স্পষ্ট ব্যাখ্যা তাদের রাজনৈতিক কৌশলের অংশ হতে পারে।
সমাবেশের শেষে উপস্থিত সকল পক্ষ একমত হন যে, ধর্মীয় স্বাধীনতা ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য রক্ষার জন্য সকল রাজনৈতিক দলকে সমন্বিতভাবে কাজ করা প্রয়োজন। তারা ভবিষ্যতে কোনো ধরনের ধর্মভিত্তিক বৈষম্য বা হিংসা না ঘটার জন্য প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণের আহ্বান জানিয়ে সমাবেশ সমাপ্ত করেন।



