যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য সচিব হাওয়ার্ড লুটনিকের সাম্প্রতিক মন্তব্যে ভারত-যুক্তরাষ্ট্র বাণিজ্য আলোচনার ভেঙে যাওয়ার মূল কারণ হিসেবে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির ট্রাম্পের সঙ্গে ফোন কল না করা উল্লেখ করা হয়েছে। লুটনিকের মতে, এই যোগাযোগের অভাবই চুক্তি সম্পন্ন না হওয়ার প্রধান বাধা, যখন ভারতীয় পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এই ব্যাখ্যাকে অযথা বলে খণ্ডন করেছে।
লুটনিক এই বক্তব্যটি All‑In পডকাস্টে দিয়েছেন, যেখানে তিনি উল্লেখ করেন যে মোদি প্রেসিডেন্টের সঙ্গে ফোনে কথা বলতে অনিচ্ছুক ছিলেন এবং ফলে আলোচনার প্রক্রিয়া বাধাগ্রস্ত হয়েছে। তিনি বলেন, “মোদি কল করেননি” এবং যুক্তরাষ্ট্রের দৃষ্টিকোণ থেকে এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ ত্রুটি।
ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় লুটনিকের মন্তব্যের পর দ্রুতই প্রতিক্রিয়া জানিয়ে বলেছে যে, আলোচনার এই ধরণটি সঠিকভাবে উপস্থাপিত হয়নি। মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র রন্ধির জয়সওয়াল বলেছেন, লুটনিকের বিবরণে ভুল তথ্য রয়েছে এবং তা বাস্তব ঘটনার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।
জয়সওয়াল আরও জানিয়েছেন যে, ২০২৫ সালে প্রধানমন্ত্রী মোদি ও প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প মোট আটবার ফোনে কথা বলেছেন এবং উভয় দেশের বিস্তৃত অংশীদারিত্বের বিভিন্ন দিক নিয়ে আলোচনা হয়েছে। এই তথ্যটি লুটনিকের দাবির সঙ্গে সরাসরি বিরোধী।
বাণিজ্য আলোচনার পটভূমি হল, ফেব্রুয়ারি ২০২৪-এ উভয় দেশই আলোচনার সূচনা করে এবং কয়েকবার চুক্তির কাছাকাছি পৌঁছেছিল। তবে যোগাযোগের ঘাটতি এবং পারস্পরিক প্রত্যাশার পার্থক্যের কারণে চূড়ান্ত চুক্তি সম্পন্ন হয়নি।
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের নির্দেশে আগস্ট মাসে ভারতীয় পণ্যের উপর শুল্ক ৫০% পর্যন্ত বাড়িয়ে দেওয়া হয়, যা বিশ্বে সর্বোচ্চ হার। এর মধ্যে ২৫% শুল্ক রাশিয়ার তেল ক্রয়ের প্রতিক্রিয়ায় আরোপিত হয়। এই পদক্ষেপটি ভারতীয় রপ্তানির উপর সরাসরি প্রভাব ফেলেছে।
শুল্ক বৃদ্ধির ফলে ভারতীয় রুপি রেকর্ড নিম্ন স্তরে পৌঁছায় এবং আন্তর্জাতিক বিনিয়োগকারীদের মধ্যে অনিশ্চয়তা বৃদ্ধি পায়। বাজারে রুপি হ্রাসের ফলে মুদ্রা রিজার্ভের উপর চাপ বাড়ে এবং শেয়ারবাজারে নেতিবাচক প্রবণতা দেখা যায়।
ভারত এখনও যুক্তরাষ্ট্রের প্রস্তাবিত শুল্ক হারকে ব্রিটেন ও ভিয়েতনামের মধ্যে থাকা স্তরের মধ্যে রাখতে চায়, তবে সেই প্রস্তাবের মেয়াদ ইতিমধ্যে শেষ হয়েছে। লুটনিক উল্লেখ করেন যে, বর্তমান শর্তে ভারতীয় সরকারকে নতুন শর্তাবলী নিয়ে আলোচনা করতে হবে।
বাণিজ্য মন্ত্রণালয় লুটনিকের মন্তব্যের ওপর কোনো মন্তব্য করতে ইমেল অনুরোধের জবাব দেয়নি, ফলে বিষয়টি আরও অনিশ্চিত রয়ে যায়।
বিশ্লেষকরা রুপি পতনের ফলে রপ্তানিকারকদের মার্জিন সংকুচিত হওয়া, ঋণগ্রহীতা ও আমদানি-নির্ভর শিল্পের ওপর চাপ বাড়া ইত্যাদি ঝুঁকি উল্লেখ করছেন। একই সঙ্গে, শুল্কের উচ্চতা বজায় থাকলে বিদেশি সরাসরি বিনিয়োগের প্রবাহ কমে যাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
ভবিষ্যৎ দৃষ্টিকোণ থেকে, যুক্তরাষ্ট্রের দিক থেকে রাশিয়ান তেল আমদানি কমাতে না পারলে শুল্কের হার আরও বাড়তে পারে, যা দুই দেশের বাণিজ্যিক সম্পর্ককে আরও কঠিন করে তুলবে। তবে উভয় পক্ষই দীর্ঘমেয়াদী কৌশলগত অংশীদারিত্ব বজায় রাখতে আলোচনার নতুন পথ খোঁজার সম্ভাবনা রাখে।
সারসংক্ষেপে, বাণিজ্য সচিবের মন্তব্য ও ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বিরোধপূর্ণ বিবৃতি বাণিজ্য আলোচনার ব্যর্থতার মূল কারণ নিয়ে পারস্পরিক মতবিরোধকে প্রকাশ করে। শুল্কের উচ্চতা, রুপি পতন এবং বিনিয়োগকারীর অনিশ্চয়তা বাজারে তীব্র প্রভাব ফেলেছে, এবং ভবিষ্যতে শুল্ক নীতি ও তেল আমদানি নিয়ন্ত্রণের ওপর নির্ভর করে দুই দেশের বাণিজ্যিক সম্পর্কের দিকনির্দেশনা নির্ধারিত হবে।



