যুক্তরাষ্ট্রের সর্বশেষ জাতীয় নিরাপত্তা কৌশল (NSS) ডিসেম্বর মাসে প্রকাশের পর ইউরোপীয় দেশগুলোকে কঠিন সিদ্ধান্তের মুখে ফেলেছে। ৮০ বছর ধরে যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের সম্পর্ক প্রতিরক্ষা, গণতন্ত্র, মানবাধিকার ও আইনের শাসনের যৌথ প্রতিশ্রুতিতে ভিত্তিক ছিল। এই ঐতিহাসিক বন্ধন ১৯৪৭ সালের মার্চে প্রেসিডেন্ট হ্যারি ট্রুম্যানের ১৮ মিনিটের ভাষণে শুরু হয়, যেখানে তিনি সোভিয়েত সম্প্রসারণের বিরুদ্ধে ইউরোপকে সমর্থন করার প্রতিশ্রুতি দেন।
সেই সময় থেকে যুক্তরাষ্ট্র ন্যাটো, বিশ্বব্যাংক, আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (IMF) এবং জাতিসংঘের প্রতিষ্ঠায় নেতৃত্ব দেয়। এই প্রতিষ্ঠানগুলোকে “নিয়ম-ভিত্তিক আন্তর্জাতিক ব্যবস্থা” বলা হয়, যেখানে দেশগুলো পারস্পরিক দায়িত্ব ও ভাগাভাগি করা বোঝাপড়া অনুযায়ী কাজ করে, যাতে স্বৈরশাসনমূলক শক্তির বিরুদ্ধে গণতান্ত্রিক বিশ্ব রক্ষা করা যায়।
নতুন NSS-এ এই ঐতিহ্যবাহী কাঠামোকে প্রশ্নবিদ্ধ করা হয়েছে। নথিতে “যা বলা হয় ‘নিয়ম-ভিত্তিক আন্তর্জাতিক ব্যবস্থা'” শব্দগুলো উল্টো উদ্ধৃতি চিহ্নে রাখা হয়েছে, যা প্রকাশের স্বভাবেই এই ধারণার বৈধতা নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করে। এই পরিবর্তনটি যুক্তরাষ্ট্রের বিশ্বে ভূমিকা সম্পর্কে দীর্ঘদিনের ধারণাকে বদলে দিতে পারে।
মিউনিখ সিকিউরিটি কনফারেন্সে ফেব্রুয়ারি ২০২৫-এ উপ-রাষ্ট্রপতি জেডি ভ্যান্স ইউরোপীয় মিত্রদের সরাসরি সতর্কতা জানান। তিনি উল্লেখ করেন, ইউরোপের প্রকৃত হুমকি রাশিয়া নয়, বরং অভ্যন্তরীণ উপাদান থেকে উদ্ভূত, যেমন মত প্রকাশের স্বাধীনতা দমন, রাজনৈতিক বিরোধী গোষ্ঠীর ওপর চাপ এবং ফলে গণতন্ত্রের ক্ষয়। তিনি “বামপন্থী উদার নেটওয়ার্ক”-কে সমালোচনা করেন।
ফরাসি দৈনিক লে মন্ডে ভ্যান্সের বক্তব্যকে ইউরোপের বিরুদ্ধে “বৈচিত্র্যময় মতাদর্শিক যুদ্ধ” হিসেবে ব্যাখ্যা করেছে। এই বিশ্লেষণটি ইউরোপীয় দেশগুলোর জন্য একটি সতর্কবার্তা হিসেবে কাজ করে, যেখানে তারা নিজেদের নিরাপত্তা ও মূল্যবোধ রক্ষার জন্য নতুন কৌশল বিবেচনা করতে হবে।
গত মাসে প্রকাশিত NSS-এ ভ্যান্সের মন্তব্যগুলোকে নথিগতভাবে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে এবং সেগুলোকে নীতি স্তরে উন্নীত করা হয়েছে। ফলে, যুক্তরাষ্ট্রের পূর্বের বিশ্বমানবিক মূল্যবোধের প্রচার এখন আর অগ্রাধিকার নয়, এই বিষয়টি আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকদের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে।
ক্যারিন ভন হিপেল, যিনি পূর্বে মার্কিন পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে উচ্চপদে ছিলেন এবং রয়্যাল ইউনাইটেড সার্ভিসেস ইনস্টিটিউটের পরিচালক হিসেবেও কাজ করেছেন, তিনি মন্তব্য করেন যে যুক্তরাষ্ট্র আর দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর থেকে গড়ে ওঠা গ্লোবাল মূল্যবোধকে সমর্থন করে না। তার বিশ্লেষণটি যুক্তরাষ্ট্রের নীতি পরিবর্তনের গভীরতা নির্দেশ করে।
ইউরোপীয় দেশগুলো এখন নিজেদের প্রতিরক্ষা ও নিরাপত্তা নীতিতে পুনর্বিবেচনা করতে বাধ্য। যুক্তরাষ্ট্রের ঐতিহ্যবাহী সুরক্ষা গ্যারান্টি হ্রাস পেলে, ন্যাটো সদস্য দেশগুলোকে স্বতন্ত্রভাবে সামরিক ও কূটনৈতিক পদক্ষেপ নিতে হতে পারে। এই পরিস্থিতি ইউরোপের নিরাপত্তা কাঠামোকে পুনর্গঠন করার প্রয়োজনীয়তা বাড়িয়ে তুলেছে।
ব্রিটেন, ফ্রান্স, জার্মানি এবং অন্যান্য প্রধান ইউরোপীয় দেশগুলো ইতিমধ্যে এই পরিবর্তনের প্রভাব নিয়ে অভ্যন্তরীণ আলোচনা চালাচ্ছে। তারা কীভাবে যুক্তরাষ্ট্রের পরিবর্তিত নীতি মোকাবেলা করবে এবং নিজেদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করবে, তা নিয়ে কৌশলগত পরিকল্পনা তৈরি করছে।
অন্যদিকে, যুক্তরাষ্ট্রের নতুন কৌশল ইউরোপের সঙ্গে পারস্পরিক সহযোগিতার নতুন রূপের ইঙ্গিত দেয়। যদিও ঐতিহ্যবাহী নিরাপত্তা গ্যারান্টি কমে গেছে, তবে অর্থনৈতিক ও প্রযুক্তিগত সহযোগিতার ক্ষেত্রগুলোতে নতুন সুযোগ দেখা দিতে পারে।
বিশ্বের অন্যান্য অঞ্চলের জন্যও এই পরিবর্তন গুরুত্বপূর্ণ। এশিয়া-প্রশান্ত মহাসাগরীয় দেশগুলো যুক্তরাষ্ট্রের নীতি পরিবর্তনকে পর্যবেক্ষণ করে তাদের নিজস্ব কূটনৈতিক কৌশল সামঞ্জস্য করতে পারে। একই সঙ্গে, রাশিয়া ও চীনের মতো শক্তিগুলোও ইউরোপের নিরাপত্তা দায়িত্বের পরিবর্তন থেকে উপকৃত হতে পারে।
সারসংক্ষেপে, যুক্তরাষ্ট্রের নতুন জাতীয় নিরাপত্তা কৌশল ইউরোপকে তার নিরাপত্তা ও মূল্যবোধ রক্ষার জন্য স্বতন্ত্র পদক্ষেপ নিতে বাধ্য করছে। ইউরোপীয় দেশগুলোকে এখন সিদ্ধান্ত নিতে হবে, তারা কীভাবে যুক্তরাষ্ট্রের পরিবর্তিত অবস্থানকে গ্রহণ করবে এবং নিজেদের কৌশলগত স্বায়ত্তশাসনকে শক্তিশালী করবে। এই প্রক্রিয়া আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা কাঠামোর পুনর্গঠনকে ত্বরান্বিত করতে পারে।



