ইরানের ধর্মীয় শাসকগোষ্ঠীকে তীব্র অর্থনৈতিক সংকটের মুখে দাঁড়াতে হচ্ছে; রিয়ালের রেকর্ড দরপতন ও মৌলিক পণ্যের দামের উর্ধ্বগতি নিয়ে তেহরানের গ্র্যান্ড বাজারে শুরু হওয়া প্রতিবাদ দ্রুত দেশব্যাপী ছড়িয়ে পড়েছে। গত মাসের শেষের দিকে শুরু হওয়া এই আন্দোলন এখন ৩১টি প্রদেশে ছড়িয়ে ৩৪ জন বিক্ষোভকারী ও চারজন নিরাপত্তা কর্মীর মৃত্যু ঘটিয়েছে এবং প্রায় ২,২০০ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। সরকার দমনমূলক পদক্ষেপ হিসেবে টিয়ার গ্যাস ব্যবহার ও ইন্টারনেট বন্ধের মাধ্যমে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করছে।
মুদ্রা রিয়ালের ধারাবাহিক পতন ও দামের দ্রুত বৃদ্ধি দেশের সাধারণ মানুষকে প্রভাবিত করে, ফলে অর্থনৈতিক অসন্তোষের শিখা জ্বলে উঠেছে। বিশেষ করে বাজারের দোকানদার ও গৃহস্থালির মানুষ এই দামের বৃদ্ধিকে সহ্য করতে পারছেন না, যা তাদের রাস্তায় নামতে প্ররোচিত করেছে। এই অর্থনৈতিক অস্থিরতা শাসকগোষ্ঠীর বৈধতা প্রশ্নবিদ্ধ করার একটি বড় কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
প্রথমে তেহরানের ঐতিহ্যবাহী গ্র্যান্ড বাজারে শুরু হওয়া প্রতিবাদ দ্রুতই অন্যান্য শহরে ছড়িয়ে পড়ে। আজ পর্যন্ত প্রতিবাদ ৩১টি প্রদেশে পৌঁছেছে, যদিও এখনও ২০২২ ও ২০২৩ সালে মহসা আমিনির মৃত্যুর পর সৃষ্ট বিশাল আন্দোলনের মাত্রায় পৌঁছায়নি। তবু এই বিক্ষোভের বিস্তার শাসনের উপর চাপ বাড়িয়ে দিচ্ছে।
গ্র্যান্ড বাজারে প্রথমে দামের উর্ধ্বগতি নিয়ে ক্ষুব্ধ দোকানদাররা রাস্তায় নামেন, পরে বিভিন্ন পেশা ও বয়সের মানুষ তাদের সঙ্গে যোগ দেন। পূর্বের মহসা আমিনি আন্দোলনের তুলনায় এবার তরুণ পুরুষদের উপস্থিতি বেশি, আর নারীর অংশগ্রহণ তুলনামূলকভাবে কম। এই পরিবর্তন শাসনের প্রতি জনমতের পরিবর্তনকে নির্দেশ করে।
মানবাধিকার সংস্থা হিউম্যান রাইটস অ্যাকটিভিস্টস নিউজ এজেন্সি জানায়, চলমান সহিংসতার ফলে অন্তত ৩৪ জন বিক্ষোভকারী এবং চারজন নিরাপত্তা কর্মী প্রাণ হারিয়েছেন। এছাড়া প্রায় ২,২০০ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে, যা শাসনের প্রতি মানুষের গভীর অসন্তোষের প্রতিফলন হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
ইন্টারনেট পর্যবেক্ষণ সংস্থা নেটব্লকসের তথ্য অনুযায়ী, গতকাল বৃহস্পতিবার থেকে দেশজুড়ে ইন্টারনেট সংযোগ বন্ধ করা হয় এবং এই অবস্থা শুক্রবার পর্যন্ত অব্যাহত থাকে। সংযোগ বিচ্ছিন্নতা তথ্যের প্রবাহকে বাধাগ্রস্ত করে, ফলে প্রতিবাদকারীরা অনলাইন প্ল্যাটফর্মে সমন্বয় করা কঠিন হয়ে পড়ে।
বহিরাগতভাবে, নির্বাসিত ইরানি নেতা রেজা পাহলভি এই সময়ে বিক্ষোভকে তীব্র করার আহ্বান জানিয়েছেন, যা শাসনের উপর আন্তর্জাতিক চাপ বাড়িয়ে দিচ্ছে। তার এই আহ্বান দেশের অভ্যন্তরে আরও বেশি মানুষকে রাস্তায় নামতে প্ররোচিত করতে পারে।
বিশ্লেষকরা উল্লেখ করেন, রিয়ালের পতন কেবল আর্থিক সমস্যাই নয়, বরং জনগণের শাসনের প্রতি বিশ্বাসের ক্ষয় ঘটিয়েছে। অর্থনৈতিক সমস্যার পাশাপাশি শাসনব্যবস্থার প্রতি আস্থা হ্রাসের ফলে রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা বাড়ছে।
সরকারের অবস্থান দ্বিমুখী; একদিকে তারা অর্থনৈতিক দাবিগুলোকে বৈধ বলে স্বীকার করে এবং সংলাপের মাধ্যমে সমাধানের ইঙ্গিত দেয়, অন্যদিকে তারা বিক্ষোভ দমন করতে টিয়ার গ্যাস ও অন্যান্য সহিংস পদ্ধতি ব্যবহার করে। এই দ্বৈত নীতি শাসনের নীতিগত অসঙ্গতি প্রকাশ করে।
ইসলামিক বিপ্লবের পাঁচ দশক পর শাসকগোষ্ঠী এখন তরুণ সমাজের প্রত্যাশা ও নিজেদের রাজনৈতিক অগ্রাধিকারের মধ্যে বড় ফাঁক অনুভব করছে। এই ফাঁক কমাতে তারা কঠিন পরিস্থিতির মুখোমুখি, যা শাসনের স্থায়িত্বকে হুমকির মুখে ফেলছে।
পশ্চিম ইরানের লোরেস্তান প্রদেশের কুহদাশত থেকে ২৫ বছর বয়সী মিনা, যিনি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতক হলেও বর্তমানে বেকার, শান্তিপূর্ণ ও স্বাভাবিক জীবন কামনা করেন। তিনি সরকারের পারমাণবিক কর্মসূচি, আঞ্চলিক সশস্ত্র গোষ্ঠীকে সমর্থন এবং যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ককে সমালোচনা করেন, যা তার মতামতে শাসনের নীতি নিয়ে অসন্তোষ প্রকাশ করে।
এই বিক্ষোভের পরবর্তী ধাপ হিসেবে শাসনকে অর্থনৈতিক সমস্যার সমাধান ও রাজনৈতিক সংস্কারের সমন্বয় করতে হবে, নতুবা আরও বড় প্রতিবাদ ও আন্তর্জাতিক বিচ্ছিন্নতার ঝুঁকি বাড়বে। বিশ্লেষকরা পূর্বাভাস দিচ্ছেন, যদি শাসন সংলাপের মাধ্যমে সমস্যার সমাধান না করতে পারে, তবে শাসনের বৈধতা আরও ক্ষয়প্রাপ্ত হবে এবং ভবিষ্যতে আরো তীব্র রাজনৈতিক পরিবর্তনের সম্ভাবনা দেখা দেবে।



