ইরানের সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি শুক্রবার (৯ জানুয়ারি) রাষ্ট্র টেলিভিশনে ট্রাম্পকে লক্ষ্য করে এক কঠোর সতর্কতা জানিয়ে বলেন, ইতিহাসের অন্যান্য স্বৈরশাসকদের মতোই যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্টকে শেষ পর্যন্ত ক্ষমতাচ্যুত হতে হবে। তিনি রেজা শাহ ও মোহাম্মদ রেজা শাহের মতো শাসকদের উদাহরণ দিয়ে দেখিয়েছেন যে অহংকারের শীর্ষে পৌঁছানো শাসক শেষ পর্যন্ত পতনের মুখে পড়ে।
খামেনি উল্লেখ করেন, দেশের বিভিন্ন শহরে চলমান প্রতিবাদে ইরান কোনোভাবে পিছু হটবে না এবং এই আন্দোলন মূলত মার্কিন প্রেসিডেন্টকে সন্তুষ্ট করার জন্যই চালু হয়েছে। তিনি যুক্তি দেন, যদি ট্রাম্প সত্যিই দেশের পরিচালনা জানতেন, তবে প্রথমে নিজের দেশের সমস্যাগুলো সমাধান করতেন। একই সঙ্গে তিনি ইরানি যুবসমাজকে ঐক্যবদ্ধ থাকার আহ্বান জানান, একতাবদ্ধ জাতি যেকোনো শত্রুকে পরাস্ত করতে সক্ষম।
ট্রাম্পের পক্ষ থেকে পূর্বে একটি সতর্কতা প্রকাশিত হয়েছিল, যেখানে তিনি ইরানের নিরাপত্তা বাহিনীকে আবারও প্রতিবাদকারীদের ওপর সহিংসতা চালালে যুক্তরাষ্ট্র কঠোর জবাব দেবে বলে উল্লেখ করেন। এই সতর্কতা প্রকাশের পর থেকে ইরানে প্রতিবাদ প্রায় দুই সপ্তাহ ধরে তীব্রতর হয়েছে, demonstrants “স্বৈরশাসকের মৃত্যু হোক” স্লোগান দিয়ে বিভিন্ন সরকারি ভবনে অগ্নিকাণ্ড ঘটিয়েছেন।
প্রতিবাদ দমনে ইরান সরকার দেশজুড়ে ইন্টারনেট সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেয়। নেটব্লকসের তথ্য অনুযায়ী, বৃহস্পতিবার গভীর রাত থেকে টানা বারো ঘণ্টারও বেশি সময় ইরান কার্যত বিশ্ব থেকে বিচ্ছিন্ন অবস্থায় ছিল। এই সময়ে সহিংসতা ও প্রাণহানির খবর অব্যাহত ছিল।
যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক মানবাধিকার সংস্থা হিউম্যান রাইটস অ্যাক্টিভিস্টস নিউজ এজেন্সি (HRANA) জানায়, এখন পর্যন্ত অন্তত ৩৪ জন প্রতিবাদকারী এবং চারজন নিরাপত্তা কর্মী নিহত হয়েছে। তদুপরি, প্রায় দুই হাজার দুইশো জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে বলে সংস্থা জানিয়েছে।
বিশ্লেষকরা বলেন, এই প্রতিবাদ শুধুমাত্র অর্থনৈতিক সংকটের ফল নয়; এটি শাসনব্যবস্থার প্রতি জনগণের গভীর হতাশার প্রকাশ। দীর্ঘমেয়াদী মুদ্রা অবমূল্যায়ন, বেকারত্ব এবং মৌলিক সেবার ঘাটতি জনমতকে উত্তেজিত করেছে। ফলে, জনগণ এখন স্বৈরশাসককে সরাসরি চ্যালেঞ্জ করছে।
ট্রাম্পের সরাসরি হস্তক্ষেপের হুমকি এবং খামেনির অনমনীয় অবস্থান দুই দেশের মধ্যে উত্তেজনা নতুন মাত্রায় নিয়ে গেছে। যুক্তরাষ্ট্রের সম্ভাব্য সামরিক বা কূটনৈতিক পদক্ষেপ ইরানের অভ্যন্তরীণ নীতি ও নিরাপত্তা কাঠামোকে প্রভাবিত করতে পারে। একই সঙ্গে, ইরানের কঠোর দমন নীতি আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থার সমালোচনার মুখে পড়েছে।
ইরানের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক দৃশ্যপটে এই পরিস্থিতি প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক অবস্থানকে প্রভাবিত করতে পারে। যদি যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্টের বিরুদ্ধে ব্যাপক আন্তর্জাতিক সমালোচনা বাড়ে, তবে তার ক্ষমতায় থাকা সময়সীমা সংকুচিত হতে পারে। অন্যদিকে, ইরানের শাসকরা এই সংকটকে অভ্যন্তরীণ ঐক্যবদ্ধতা বাড়ানোর সুযোগ হিসেবে ব্যবহার করতে পারে।
প্রতিবাদকারীদের দাবিগুলো মূলত অর্থনৈতিক স্বচ্ছতা, দারিদ্র্য হ্রাস এবং রাজনৈতিক স্বাধীনতা নিশ্চিত করা। তবে, সরকারী দৃষ্টিকোণ থেকে নিরাপত্তা বাহিনীর ওপর আক্রমণকে জাতীয় নিরাপত্তার হুমকি হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে। ফলে, উভয় পক্ষের মধ্যে সংঘাতের তীব্রতা বাড়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকরা ইরানের ইন্টারনেট বন্ধের ফলে তথ্য প্রবাহের বাধা এবং মানবাধিকার লঙ্ঘনের সম্ভাবনা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। নেটব্লকসের রিপোর্ট ইঙ্গিত করে যে, ইন্টারনেটের দীর্ঘস্থায়ী বিচ্ছিন্নতা নাগরিকদের সংগঠন ও প্রতিবাদে বাধা সৃষ্টি করেছে, তবে একই সঙ্গে সরকারকে আন্তর্জাতিক নজরদারির মুখে এনেছে।
সামগ্রিকভাবে, খামেনির ট্রাম্পের বিরুদ্ধে হুঁশিয়ারি এবং যুক্তরাষ্ট্রের সম্ভাব্য কঠোর জবাবের মধ্যে পারস্পরিক উত্তেজনা উভয় দেশের অভ্যন্তরীণ ও বহিরাগত নীতি গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। ভবিষ্যতে কী ধরনের কূটনৈতিক পদক্ষেপ নেওয়া হবে, তা নির্ভর করবে উভয় দেশের নেতৃত্বের কৌশল ও আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের প্রতিক্রিয়ার উপর।



