কলম্বিয়ার প্রেসিডেন্ট গুস্তাভো পেত্রো সম্প্রতি বিবিসি-তে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে যুক্তরাষ্ট্রকে তার দেশের নিরাপত্তার জন্য একটি বাস্তব সামরিক হুমকি হিসেবে উল্লেখ করেন। তিনি যুক্তরাষ্ট্রের দীর্ঘদিনের নীতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেন যে, আমেরিকা অন্যান্য দেশকে নিজের সাম্রাজ্যের অংশ হিসেবে দেখছে এবং এই দৃষ্টিভঙ্গি লাতিন আমেরিকায় তার পদচিহ্নকে গভীরভাবে প্রভাবিত করছে। পেত্রোর মন্তব্যের পটভূমি হল ডোনাল্ড ট্রাম্পের সাম্প্রতিক সময়ে কলম্বিয়াকে লক্ষ্য করে সম্ভাব্য সামরিক পদক্ষেপের ইঙ্গিত, যা লাতিন আমেরিকান নেতাদের মধ্যে তীব্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করেছে।
পেত্রো যুক্তরাষ্ট্রের অভিবাসন ও শুল্ক সংস্থা আইস (ICE) এর কার্যক্রমের কঠোর সমালোচনা করেন। তিনি উল্লেখ করেন যে, আইসের এজেন্টদের আচরণকে নাৎসি ব্রিগেডের সঙ্গে তুলনা করা হয়েছে এবং ট্রাম্প প্রশাসন অধিনে আইসের ক্ষমতা ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। এই নীতি, পেত্রো মতে, কেবল লাতিন আমেরিকানদের নয়, যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিকদেরও নিরাপত্তা ঝুঁকির মধ্যে ফেলছে।
ট্রাম্পের মন্তব্যের মধ্যে রয়েছে ভেনেজুয়েলায় যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক হস্তক্ষেপ এবং দেশের নেতা নিকোলাস মাদুরোকে আটক করার পর কলম্বিয়ার সম্ভাব্য সামরিক অভিযানকে “ভালো ধারণা” হিসেবে উল্লেখ করা। পেত্রোকে সরাসরি লক্ষ্য করে একাধিক হুমকিসূচক বক্তব্যের পরেও, তিনি এই ধরনের রেটোরিককে কঠোরভাবে নিন্দা করেন এবং যুক্তরাষ্ট্রের আন্তর্জাতিক নীতিতে অবিশ্বাসের ইঙ্গিত দেন।
বুধবার সন্ধ্যায় ট্রাম্প ও পেত্রোর মধ্যে টেলিফোনিক আলোচনা হয়। ফোনালাপটি এক ঘণ্টার কম সময় স্থায়ী হয় এবং মূলত মাদক পাচার, ভেনেজুয়েলার বর্তমান অবস্থা এবং লাতিন আমেরিকায় যুক্তরাষ্ট্রের ভূমিকা নিয়ে কেন্দ্রীভূত হয়। ট্রাম্প কথোপকথনের শেষে হোয়াইট হাউসে পেত্রোর সঙ্গে সরাসরি সাক্ষাতের ইচ্ছা প্রকাশ করেন, যা তিনি “বড় সম্মান” বলে উল্লেখ করেন। তবে পরের দিন পেত্রোর প্রকাশে স্পষ্ট হয়, দুই দেশের মধ্যে কোনো উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি ঘটেনি।
পেত্রো জোর দিয়ে বলেন, আইসের বর্তমান অবস্থান এমন যে, এটি কেবল লাতিন আমেরিকানদের নয়, যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিকদেরও ঝুঁকির মুখে ফেলছে। তিনি সতর্ক করেন, যদি এই প্রবণতা অব্যাহত থাকে, তবে যুক্তরাষ্ট্র তার বৈশ্বিক শাসনের স্বপ্ন হারিয়ে আন্তর্জাতিক মঞ্চে একাকী হয়ে পড়বে। পেত্রোর মতে, যুক্তরাষ্ট্র বহু দশক ধরে, বিশেষ করে লাতিন আমেরিকায়, আন্তর্জাতিক আইনকে উপেক্ষা করে অন্য দেশকে সাম্রাজ্যবাদী দৃষ্টিকোণ থেকে দেখছে।
এই বিবৃতি লাতিন আমেরিকায় যুক্তরাষ্ট্রের নীতি নিয়ে চলমান বিতর্ককে তীব্র করে তুলেছে। পেত্রোর মন্তব্য এবং ট্রাম্পের সামরিক ইঙ্গিতের মধ্যে পারস্পরিক উত্তেজনা, দুই দেশের কূটনৈতিক সম্পর্ককে আরও জটিল করে তুলতে পারে। বিশেষত, কলম্বিয়া ও যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্যিক ও নিরাপত্তা সহযোগিতা ভবিষ্যতে পুনর্বিবেচনার মুখে পড়তে পারে।
বিশ্লেষকরা ইঙ্গিত করছেন, পেত্রোর এই সতর্কবার্তা লাতিন আমেরিকান দেশগুলোর মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাবকে সীমিত করার একটি কৌশল হতে পারে। একই সঙ্গে, ট্রাম্পের সামরিক হুমকি এবং আইসের কঠোর নীতি, যুক্তরাষ্ট্রের আন্তর্জাতিক সুনামকে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে, বিশেষত মানবাধিকার সংস্থার সমালোচনার মুখে।
পরবর্তী সময়ে, কলম্বিয়া ও যুক্তরাষ্ট্রের কূটনৈতিক চ্যানেলগুলো কীভাবে এই উত্তেজনাকে সামাল দেবে, তা লাতিন আমেরিকায় যুক্তরাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ ভূমিকা নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ হবে। পেত্রোর উল্লেখিত বিষয়গুলো, যদি সমাধান না হয়, তবে অঞ্চলে নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক সহযোগিতার ওপর দীর্ঘমেয়াদী প্রভাব ফেলতে পারে।
এই ঘটনাগুলোকে কেন্দ্র করে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের দৃষ্টিভঙ্গি এবং লাতিন আমেরিকান দেশগুলোর স্বায়ত্তশাসন রক্ষার প্রচেষ্টা, যুক্তরাষ্ট্রের নীতি পরিবর্তনের প্রয়োজনীয়তা নিয়ে নতুন আলোচনার সূচনা করতে পারে।



