রাশিয়ার সামরিক বাহিনী শুক্রবার (৯ জানুয়ারি) হাইপারসনিক ‘ওরেশনিক’ ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করে ইউক্রেনের লভিভ অঞ্চলের একটি গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি অবকাঠামোকে আঘাত করে। রাশিয়া দাবি করে যে, এই আক্রমণটি ডিসেম্বরের শেষের দিকে ইউক্রেনীয় ড্রোনের মাধ্যমে প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের বাসভবনে করা হামলার প্রতিক্রিয়া। ইউক্রেনের সরকার এই অভিযোগকে সম্পূর্ণ মিথ্যা বলে খণ্ডন করেছে।
রাশিয়ার রক্ষা মন্ত্রণালয় জানায়, ‘ওরেশনিক’ ক্ষেপণাস্ত্রের গতি ঘণ্টায় প্রায় ১৩,০০০ কিলোমিটার, যা শব্দের গতির দশ গুণের বেশি। ইউক্রেনীয় বিমান বাহিনীর তথ্য অনুযায়ী, এই ক্ষেপণাস্ত্রটি লক্ষ্যবস্তুতে পৌঁছানোর সময় উচ্চ গতিতে প্রবেশ করে, ফলে গ্যাস সংরক্ষণাগারের মতো ভূগর্ভস্থ সুবিধা দ্রুত ধ্বংসের ঝুঁকি তৈরি করে। লভিভের গভর্নর উল্লেখ করেন, আঘাতপ্রাপ্ত স্থাপনাটি সম্ভবত একটি বিশাল গ্যাস স্টোরেজ, যা শীতকালে দেশের বিদ্যুৎ ও গ্যাস সরবরাহে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
‘ওরেশনিক’ প্রথমবার ব্যবহার করা হয়েছিল ২০২৪ সালের নভেম্বর মাসে, যখন রাশিয়া ইউক্রেনের একটি সামরিক কারখানায় আক্রমণ চালায়। সেই সময় ইউক্রেনীয় সূত্রগুলো দাবি করেছিল যে, ক্ষেপণাস্ত্রের ওয়ারহেডে কোনো বিস্ফোরক ছিল না, বরং ডামি হেড ব্যবহার করা হয়েছিল। তবে বর্তমান আক্রমণে রাশিয়া দাবি করে যে, ওয়ারহেডের ধ্বংসক্ষমতা পারমাণবিক অস্ত্রের সমান, যদিও এটি সাধারণ ধরণের ওয়ারহেড ব্যবহার করে।
পুতিন এই অস্ত্রের ক্ষমতা নিয়ে আত্মবিশ্বাস প্রকাশ করে বলেন, বর্তমান প্রযুক্তিতে ‘ওরেশনিক’ ক্ষেপণাস্ত্রকে প্রতিহত করা প্রায় অসম্ভব। তার এই মন্তব্যের পরেও পশ্চিমা সামরিক বিশ্লেষকরা সতর্কতা প্রকাশ করে, যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক কর্মকর্তারা উল্লেখ করেন যে, হাইপারসনিক অস্ত্রের উপস্থিতি যুদ্ধের গতিপথে বড় পরিবর্তন আনবে না এবং তা ‘গেম-চেঞ্জার’ হিসেবে বিবেচিত হওয়া উচিত নয়।
নাটো এবং ইউরোপীয় ইউনিয়নের শীর্ষস্থানীয় কূটনীতিকরা রাশিয়ার এই পদক্ষেপকে আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা ব্যবস্থার গুরুতর লঙ্ঘন হিসেবে উল্লেখ করে, ইউক্রেনের সার্বভৌমত্বের প্রতি সম্মান বজায় রাখতে একতাবদ্ধ অবস্থান গ্রহণের আহ্বান জানিয়েছেন। যুক্তরাষ্ট্রের দায়িত্বপ্রাপ্ত কূটনীতিকও রাশিয়ার হাইপারসনিক আক্রমণকে ‘অপ্রয়োজনীয় উত্তেজনা বৃদ্ধি’ হিসেবে চিহ্নিত করে, সম্ভাব্য অতিরিক্ত নিষেধাজ্ঞা ও কূটনৈতিক চাপের ইঙ্গিত দিয়েছেন।
অঞ্চলীয় বিশ্লেষকরা উল্লেখ করেন, রাশিয়ার এই ধরনের উচ্চগতির অস্ত্র ব্যবহার ইউক্রেনের শীতকালীন জ্বালানি সরবরাহকে বিপন্ন করতে পারে, বিশেষ করে যদি গ্যাস সংরক্ষণাগার ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ইউক্রেনের বিদ্যুৎ গ্রিড ইতিমধ্যে যুদ্ধের ফলে ক্ষতিগ্রস্ত, এবং অতিরিক্ত জ্বালানি ঘাটতি দেশের নাগরিকদের মৌলিক চাহিদা পূরণে বাধা সৃষ্টি করতে পারে। তাই আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের ত্বরিত সহায়তা ও বিকল্প জ্বালানি সরবরাহের পরিকল্পনা জরুরি হয়ে দাঁড়িয়েছে।
ইউক্রেনের সরকার রাশিয়ার আক্রমণকে ‘অবৈধ ও অমানবিক’ বলে নিন্দা করে, এবং জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদে এই ঘটনার তদন্তের দাবি জানিয়েছে। একই সঙ্গে, ইউক্রেনের সামরিক বাহিনী জানায় যে, তারা ভবিষ্যতে হাইপারসনিক হুমকির মোকাবিলার জন্য প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা শক্তিশালী করবে, যদিও বর্তমানে এমন প্রযুক্তি প্রতিহত করা কঠিন।
বিশ্বের নিরাপত্তা বিশ্লেষকরা ভবিষ্যতে রাশিয়া ও ইউক্রেনের মধ্যে হাইপারসনিক অস্ত্রের ব্যবহার বাড়তে পারে বলে সতর্ক করেন, যা ইউরোপীয় নিরাপত্তা কাঠামোর জন্য নতুন চ্যালেঞ্জ সৃষ্টি করবে। তারা পরামর্শ দেন, আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে হাইপারসনিক প্রযুক্তির নিয়ন্ত্রণে আন্তর্জাতিক চুক্তি গড়ে তোলার দিকে মনোযোগ দিতে হবে, যাতে এই ধরনের অস্ত্রের বিস্তার রোধ করা যায়।
পরবর্তী সপ্তাহগুলোতে রাশিয়া ও ইউক্রেনের কূটনৈতিক সংলাপের অগ্রগতি, ন্যাটো ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের অতিরিক্ত সহায়তা প্যাকেজ, এবং যুক্তরাষ্ট্রের সম্ভাব্য নতুন নিষেধাজ্ঞা এই সংঘর্ষের গতিপথ নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। একই সঙ্গে, জাতিসংঘের মানবিক সহায়তা মিশন গ্যাস সংরক্ষণাগারের সম্ভাব্য ক্ষতি মোকাবিলায় জরুরি পদক্ষেপ নিতে পারে, যাতে শীতকালে ইউক্রেনের নাগরিকদের মৌলিক চাহিদা পূরণে বাধা না আসে।
এই ঘটনাটি পূর্ব ইউরোপের নিরাপত্তা পরিবেশকে আরও জটিল করে তুলেছে, এবং হাইপারসনিক অস্ত্রের ব্যবহার আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা নীতিতে নতুন আলোচনার সূচনা করতে পারে।



