ভেনেজুয়েলা, যা বিশ্বে সবচেয়ে বড় তেল মজুদের দেশ হিসেবে পরিচিত, তেলের পাশাপাশি বিশাল পরিমাণে খনিজ, প্রাকৃতিক গ্যাস, সোনা এবং অন্যান্য মূল্যবান ধাতু সংরক্ষণ করে। সাম্প্রতিক সময়ে প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোর অপহরণ ঘটনার পর যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সরকার তেল উৎপাদন পুনরুদ্ধার এবং খনন শিল্পের সম্প্রসারণে আগ্রহ প্রকাশ করেছে।
গত রবিবার যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য মন্ত্রী হাওয়ার্ড লুটনিক এয়ারফোর্স ওয়ানে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলোচনায় উল্লেখ করেন, ভেনেজুয়েলায় ইস্পাত, বিভিন্ন ধরণের খনিজ এবং অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ সম্পদ রয়েছে, যদিও ঐতিহাসিকভাবে এই সম্পদগুলো দীর্ঘদিন অবহেলিত ছিল।
ভেনেজুয়েলার প্রমাণিত তেল মজুদের পরিমাণ প্রায় ৩০৩ বিলিয়ন ব্যারেল, যা যুক্তরাষ্ট্রের মজুদের তুলনায় পাঁচ গুণেরও বেশি। দেশটি ১৯৬০ সালে ইরান, ইরাক, কুয়েত ও সৌদি আরবের সঙ্গে বাগদাদে OPEC গঠনে অংশ নেয় এবং প্রতিষ্ঠাতা সদস্য হিসেবে স্বীকৃত। প্রধান তেল ক্ষেত্রটি পূর্ব ভেনেজুয়েলার অরিনোকো বেল্টে অবস্থিত, যা প্রায় ৫৫,০০০ বর্গকিলোমিটার এলাকা জুড়ে বিস্তৃত এবং রাষ্ট্রায়ত্ত পেট্রোলিওস দে ভেনেজুয়েলা (PDVSA) এর নিয়ন্ত্রণে। তেল উত্তোলন প্রযুক্তিগতভাবে জটিল এবং ব্যয়বহুল হওয়ায়, উৎপাদিত তেল তুলনামূলকভাবে কম দামে রপ্তানি করা হয়।
এক সময় যুক্তরাষ্ট্র ভেনেজুয়েলার সবচেয়ে বড় তেল ক্রেতা ছিল, তবে রাজনৈতিক অস্থিরতা, দুর্নীতি, বিনিয়োগ সংকট এবং আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞার ফলে উৎপাদন উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস পেয়েছে। বর্তমানে চীন ভেনেজুয়েলার প্রধান তেল ক্রেতা, এবং ২০২৫ সালের নভেম্বর পর্যন্ত রপ্তানিকৃত তেলের প্রায় ৮১.৭ শতাংশ চীনে পৌঁছেছে। এই প্রবণতা চীনের শক্তি নিরাপত্তা ও জ্বালানি সরবরাহের কৌশলগত গুরুত্বকে তুলে ধরে।
প্রাকৃতিক গ্যাসের ক্ষেত্রে ভেনেজুয়েলা বিশ্বে নবম স্থানে রয়েছে, মোট প্রায় ৫.৫ ট্রিলিয়ন ঘনমিটার গ্যাস সংরক্ষণ রয়েছে, যা দক্ষিণ আমেরিকার গ্যাস মজুদের একটি বড় অংশ গঠন করে। গ্যাসের এই বিশাল পরিমাণ ভবিষ্যতে দেশটির জ্বালানি রপ্তানি বৈচিত্র্যকরণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে, বিশেষত যখন তেল রপ্তানি সংকটে পড়ে।
স্বর্ণের ক্ষেত্রে ভেনেজুয়েলা লাতিন আমেরিকায় শীর্ষে অবস্থান করে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের রেকর্ড অনুযায়ী প্রায় ১৬১.২ টন স্বর্ণ সংরক্ষিত, এবং সরকারিভাবে স্বীকৃত হিসাব অনুযায়ী অন্তত ৬৪৪ টন স্বর্ণ মজুতে রয়েছে, যদিও প্রকৃত পরিমাণ আরও বেশি হতে পারে বলে অনুমান করা হয়। স্বর্ণের এই সম্পদ দেশীয় মুদ্রা স্থিতিশীলতা এবং আন্তর্জাতিক আর্থিক বাজারে লিকুইডিটি বৃদ্ধিতে সহায়তা করতে পারে।
তেল ও গ্যাসের পাশাপাশি ভেনেজুয়েলায় কয়লা, লৌহ আকরিক এবং অন্যান্য ধাতুও বিদ্যমান, যা শিল্প ভিত্তিক রপ্তানি সম্প্রসারণের সম্ভাবনা তৈরি করে। তবে দীর্ঘ সময়ের অবহেলা, অবকাঠামোর ঘাটতি এবং আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা এই সম্পদগুলোর ব্যবহারিকতা সীমিত করেছে।
বাজার বিশ্লেষকরা উল্লেখ করেন, যুক্তরাষ্ট্রের তেল ও খনন শিল্পে পুনরায় প্রবেশের ইচ্ছা ভেনেজুয়েলার অর্থনীতিতে নতুন বিনিয়োগের সঞ্চার ঘটাতে পারে, তবে একই সঙ্গে রাজনৈতিক ঝুঁকি এবং আইনি বাধা মোকাবেলায় কৌশলগত পরিকল্পনা প্রয়োজন। চীনের তেল চাহিদা বজায় থাকায় ভেনেজুয়েলার রপ্তানি আয় স্থিতিশীল থাকতে পারে, তবে বৈশ্বিক তেল মূল্যের ওঠানামা এবং নিষেধাজ্ঞা পুনরায় আরোপের সম্ভাবনা রপ্তানি আয়কে প্রভাবিত করতে পারে।
ভেনেজুয়েলার সম্পদ ভিত্তিক অর্থনৈতিক পুনরুজ্জীবনের জন্য আন্তর্জাতিক আর্থিক প্রতিষ্ঠান এবং বেসরকারি বিনিয়োগকারীদের স্বচ্ছ নীতি, আইনি নিরাপত্তা এবং অবকাঠামো উন্নয়নে সমর্থন দরকার। তেল ও গ্যাসের পাশাপাশি খনিজ ও ধাতু শিল্পে বৈচিত্র্যকরণ করলে দেশটি একক রপ্তানি পণ্যের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে দীর্ঘমেয়াদী স্থিতিশীলতা অর্জন করতে পারে।
সারসংক্ষেপে, ভেনেজুয়েলা তেল, গ্যাস, স্বর্ণ এবং বিভিন্ন ধাতু সংরক্ষণে সমৃদ্ধ, এবং যুক্তরাষ্ট্রের নতুন আগ্রহ ও চীনের ক্রমবর্ধমান চাহিদা দেশটির অর্থনৈতিক দিকনির্দেশনা পরিবর্তনের সম্ভাবনা তৈরি করেছে। তবে রাজনৈতিক অস্থিরতা, নিষেধাজ্ঞা এবং অবকাঠামো ঘাটতি এখনও বড় চ্যালেঞ্জ রয়ে গেছে, যা ভবিষ্যৎ বিনিয়োগ ও বাজারের গতিপথকে প্রভাবিত করবে।



