বিশ্বব্যাংকের একটি প্রতিনিধি দল আগামী সোমবার ঢাকায় উপস্থিত হবে, গাবতলী থেকে ডেমরা পর্যন্ত মেট্রোরেল লাইন‑২ (এমআরটি‑২) প্রকল্পের জন্য ঋণ ও প্রযুক্তিগত সহায়তা নিয়ে আলোচনা করার উদ্দেশ্যে। এই উদ্যোগের মূল লক্ষ্য হল প্রকল্পের সম্ভাব্যতা সমীক্ষা, বিস্তারিত নকশা এবং দরপত্র প্রক্রিয়া শুরু করা।
ঢাকা মেট্রো ট্রানজিট কোম্পানি লিমিটেড (ডিএমটিসিএল) মেট্রোরেল পরিচালনা ও রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্বে রয়েছে। সরকারী সূত্র অনুযায়ী, ডিএমটিসিএল এখন বিশ্বব্যাংকের সঙ্গে সমন্বয় করে একটি কারিগরি সহায়তা প্রকল্প গঠন করছে, যা লাইন‑২ এর বাস্তবায়নের ভিত্তি স্থাপন করবে।
বিশ্বব্যাংক এই প্রকল্পের জন্য ২৫ লক্ষ ডলার (প্রায় ২.৫ মিলিয়ন মার্কিন ডলার) গ্রান্ট প্রদান করবে। এই অনুদানটি মূলত সমীক্ষা, নকশা প্রণয়ন এবং টেন্ডার প্রস্তুতির জন্য প্রয়োজনীয় প্রযুক্তিগত সহায়তা নিশ্চিত করবে। গ্রান্টের পরিমাণ নির্ধারিত হলেও, প্রকল্পের মোট ব্যয় এখনও সমীক্ষা ও নকশা শেষ হওয়ার পরই চূড়ান্ত করা হবে।
প্রাথমিকভাবে গাবতলী থেকে নারায়ণগঞ্জ সদর পর্যন্ত ৩৫ কিলোমিটার লাইন পরিকল্পনা করা হয়েছিল, যার অনুমানিক খরচ প্রায় ৬১ হাজার কোটি টাকা ছিল। তবে ঢাকা পরিবহন সমন্বয় কর্তৃপক্ষের হালনাগাদ কৌশলগত পরিকল্পনা অনুযায়ী রুটটি গাবতলী থেকে ডেমরা পর্যন্ত সংক্ষিপ্ত করা হয়েছে, যার দৈর্ঘ্য ২৩.৫ কিলোমিটার।
নতুন রুটের মধ্যে গাবতলী, ঢাকা উদ্যান, বসিলা মোড়, মোহাম্মদপুর বিআরটিসি বাসস্ট্যান্ড, জিগাতলা, সায়েন্স ল্যাব, নিউমার্কেট, আজিমপুর, লালবাগ, চকবাজার, মিটফোর্ড, নয়াবাজার, ধোলাইখাল, দয়াগঞ্জ, কাজলা এবং ডেমরা হয়ে তাড়াবো বাসস্ট্যান্ড অন্তর্ভুক্ত। এই স্টেশনগুলো শহরের প্রধান বাণিজ্যিক ও আবাসিক এলাকা সংযুক্ত করবে, ফলে যাত্রী প্রবাহে উল্লেখযোগ্য বৃদ্ধি প্রত্যাশিত।
বিশ্বব্যাংকের ঋণ সুবিধা মূলত নিম্ন সুদের হার ও দীর্ঘমেয়াদী পরিশোধ শর্তে প্রদান করা হবে, যা সরকারি বাজেটের চাপ কমিয়ে প্রকল্পের নগদ প্রবাহ স্থিতিশীল করতে সহায়তা করবে। আর্থিক বিশ্লেষকরা উল্লেখ করছেন, এই ধরনের আন্তর্জাতিক অর্থায়ন দেশের অবকাঠামো উন্নয়নে বিনিয়োগের আকর্ষণ বাড়াবে এবং স্থানীয় ব্যাংকিং সেক্টরের জন্য নতুন ক্রেডিট সুযোগ সৃষ্টি করবে।
নির্মাণ পর্যায়ে স্থানীয় কন্ট্রাক্টর, ইঞ্জিনিয়ারিং ফার্ম এবং সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানগুলোকে বড় পরিমাণের চুক্তি পাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। বিশেষ করে উঁচু সেতু, টানেল ও স্টেশন নির্মাণে জড়িত কোম্পানিগুলো কর্মসংস্থান বৃদ্ধি এবং প্রযুক্তি স্থানান্তরের মাধ্যমে উপকৃত হবে।
প্রত্যাশিত দৈনিক যাত্রী সংখ্যা ১.৫ লক্ষের ওপর পৌঁছাতে পারে, যা মেট্রোরেলের আয় বৃদ্ধিতে সরাসরি প্রভাব ফেলবে। টিকিট মূল্যের সমন্বয় এবং বিজ্ঞাপন আয়ের সম্ভাবনা মিলিয়ে লাইন‑২ দীর্ঘমেয়াদে স্বনির্ভরতা অর্জনের লক্ষ্য রাখবে।
প্রকল্পের অংশ হিসেবে ডিএমটিসিএলকে প্রতিষ্ঠানিক সক্ষমতা বাড়ানোর জন্য একটি স্ট্রেন্ডেনিং প্রোগ্রামও অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। এতে ব্যবস্থাপনা কাঠামো, আর্থিক নিয়ন্ত্রণ এবং রক্ষণাবেক্ষণ সিস্টেমের আধুনিকীকরণ অন্তর্ভুক্ত, যা ভবিষ্যতে অন্যান্য মেট্রো লাইন চালু করার ভিত্তি তৈরি করবে।
এই কারিগরি সহায়তা প্রকল্পটি বর্তমানে পরিকল্পনা কমিশনের অনুমোদনের প্রক্রিয়ায় রয়েছে। অনুমোদন পাওয়ার পরই ডিএমটিসিএল সমীক্ষা ও নকশা কাজের জন্য প্রয়োজনীয় তহবিল মুক্তি পাবে এবং দরপত্র প্রকাশের সময়সূচি নির্ধারণ করা হবে।
বিশ্লেষকরা সতর্ক করছেন, প্রকল্পের সময়সূচি ও ব্যয় নিয়ন্ত্রণে দেরি হলে আর্থিক ঝুঁকি বাড়তে পারে। তাই সমীক্ষা পর্যায়ে সঠিক ডেটা সংগ্রহ এবং নকশা পর্যায়ে বাস্তবিক বাস্তবায়নযোগ্যতা যাচাই করা জরুরি। তবুও, বিশ্বব্যাংকের অংশগ্রহণ এবং সরকারি ইচ্ছাশক্তি মিলিয়ে গাবতলী‑ডেমরা মেট্রোরেল লাইন‑২ দেশের পরিবহন অবকাঠামোর একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হয়ে উঠবে।



