ইরানের রাজধানী তেহরানে বৃহস্পতিবার বৃহত্তম প্রতিবাদে অংশগ্রহণকারীরা ধর্মীয় শাসনের নীতির বিরোধিতা করে তীব্র প্রতিবাদ চালিয়ে গেছেন। ইন্টারনেট সংযোগ কেটে দেওয়া হয়েছে এবং নিরাপত্তা বাহিনীর দমনমূলক পদক্ষেপে নিহতের সংখ্যা বাড়ছে। এই পরিস্থিতি দেশের অর্থনৈতিক সংকট ও আন্তর্জাতিক চাপের সঙ্গে যুক্ত, যা জনমতকে আরও উত্তেজিত করেছে।
প্রতিবাদটি ২৮ ডিসেম্বর তেহরানের বাজারে রিয়াল মুদ্রার রেকর্ড নিম্নগামী মূল্যের ফলে বন্ধ হয়ে যাওয়া থেকে শুরু হয়। মুদ্রা পতনের ফলে জনগণের ক্রয়ক্ষমতা হ্রাস পায় এবং তাৎক্ষণিকভাবে রাস্তায় অসন্তোষের স্ফুলিঙ্গ জ্বলে ওঠে। এরপর থেকে এই আন্দোলন দেশব্যাপী ছড়িয়ে পড়ে, বিশেষ করে রাজধানীর প্রধান সড়ক ও চত্বরে বড় আকারে সমাবেশ হয়।
প্রায় দুই সপ্তাহের ধারাবাহিক প্রতিবাদে অংশগ্রহণকারীর সংখ্যা ক্রমশ বৃদ্ধি পেয়েছে। তেহরানের কাশানি বুলেভার্ডে বিশাল জনসমাগম দেখা যায়, যেখানে প্রতিবাদকারীরা সরকারকে অর্থনৈতিক নীতি ও রাজনৈতিক দমন থেকে মুক্তি চায়। অন্যান্য শহরেও একই রকম সমাবেশের ছবি সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে, যা সরকারকে কঠোর পদক্ষেপ নিতে বাধ্য করে।
শাসক আয়াতুল্লাহ আলি খামেনেইয়ের নেতৃত্বাধীন সরকার নিরাপত্তা বাহিনীর মাধ্যমে প্রতিবাদ দমন করতে ইন্টারনেট সেবা বন্ধ করেছে। ইন্টারনেট সংযোগের বিচ্ছিন্নতা তথ্যের প্রবাহকে বাধাগ্রস্ত করে, তবে তা সত্ত্বেও প্রতিবাদকারীরা রাস্তায় উপস্থিত থাকে। নিরাপত্তা বাহিনীর উপস্থিতি বাড়লেও, demonstrators এখনও রাত পর্যন্ত সমাবেশ বজায় রাখে।
নরওয়ে ভিত্তিক মানবাধিকার সংস্থা ইরান হিউম্যান রাইটস (IHR) বৃহস্পতিবার জানিয়েছে যে নিরাপত্তা বাহিনী কমপক্ষে ৪৫ জন প্রতিবাদকারীকে গুলি করে হত্যা করেছে, যার মধ্যে আটজন নাবালক অন্তর্ভুক্ত। সংস্থার মতে, বুধবারের দিন সর্বাধিক প্রাণহানি ঘটেছে, যেখানে ১৩ জনের মৃত্যু নিশ্চিত হয়েছে।
ইরান হিউম্যান রাইটসের পরিচালক মাহমুদ আমিরি-মোগহাদাম উল্লেখ করেছেন, “প্রতিবাদ দমন করার পদ্ধতি প্রতিদিন আরও বেশি হিংসাত্মক ও বিস্তৃত হচ্ছে”। তিনি আরও জানান, শত শত মানুষ আহত হয়েছে এবং ২,০০০ এরও বেশি ব্যক্তি গ্রেপ্তার হয়েছে। এই তথ্যগুলো সরকারী সূত্রের সঙ্গে পার্থক্যপূর্ণ, যা পরিস্থিতির জটিলতা বাড়িয়ে তুলেছে।
আফপিএ (AFP) সূত্রে জানানো হয়েছে, সরকারী ও মিডিয়া রিপোর্টে অন্তত ২১ জনের মৃত্যু নিশ্চিত করা হয়েছে, যার মধ্যে নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যরাও অন্তর্ভুক্ত। তেহরানের পশ্চিমে একটি পুলিশ কর্মকর্তা প্রতিবাদ দমন করার প্রচেষ্টায় নিহত হয়। এই ঘটনার পর নিরাপত্তা বাহিনীর কঠোরতা বাড়ার সম্ভাবনা দেখা যাচ্ছে।
প্রতিবাদকারীরা তেহরানের কাশানি বুলেভার্ডে বিশাল ভিড় গড়ে তুলেছে, যা সামাজিক মাধ্যমে শেয়ার করা ছবিগুলোতে স্পষ্ট দেখা যায়। অন্যান্য শহরের ছবি দেখায়, মানুষ এখনও রাস্তায় সমাবেশ করে সরকারকে তাদের দাবি শোনার আহ্বান জানাচ্ছে। ইন্টারনেট বন্ধ থাকা সত্ত্বেও, এই সমাবেশগুলো সামাজিক মিডিয়ার মাধ্যমে বিস্তৃত হয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের অফিসিয়াল বিবৃতি অনুযায়ী, যদি ইরান নিরাপত্তা বাহিনীর দ্বারা মানুষকে হত্যা করা অব্যাহত রাখে, তবে যুক্তরাষ্ট্র কঠোর পদক্ষেপ নেবে। তিনি উল্লেখ করেন, “আমরা তাদের ওপর কঠোর আঘাত হানব”। এই সতর্কতা আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের দৃষ্টিতে ইরানের অভ্যন্তরীণ অশান্তিকে নতুন মাত্রা দিচ্ছে।
অর্থনৈতিক সংকট, আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা এবং ইসরায়েলের সঙ্গে সাম্প্রতিক যুদ্ধের পরিণতি ইরানের রাজনৈতিক পরিবেশকে অস্থির করে তুলেছে। সরকারী শাসনব্যবস্থা এই চ্যালেঞ্জের মুখে কঠোর নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে, যা জনমতকে আরও উত্তেজিত করে।
বিশ্লেষকরা অনুমান করছেন, যদি নিরাপত্তা বাহিনীর দমনমূলক পদক্ষেপ অব্যাহত থাকে, তবে প্রতিবাদ তীব্রতর হতে পারে এবং আরও বড় জনসাধারণের অংশগ্রহণ ঘটতে পারে। অন্যদিকে, আন্তর্জাতিক চাপ বাড়লে ইরানের শাসকরা আলোচনার পথে ফিরে আসতে বাধ্য হতে পারে।
সারসংক্ষেপে, ইরানে চলমান প্রতিবাদে মৃত্যুর সংখ্যা বাড়ছে, ইন্টারনেট সংযোগ কাটা হয়েছে এবং নিরাপত্তা বাহিনীর কঠোর দমনমূলক পদক্ষেপের ফলে রাজনৈতিক অস্থিরতা বৃদ্ধি পেয়েছে। ভবিষ্যতে কীভাবে এই পরিস্থিতি বিকশিত হবে, তা আন্তর্জাতিক ও দেশীয় উভয় দিকের নীতি নির্ধারণের উপর নির্ভরশীল।



