বাংলাদেশের তৈরি পোশাক ও বস্ত্র খাতের ব্যবসায়ীরা ভারতীয় সুতা আমদানি সংক্রান্ত শুল্ক প্রয়োগের সিদ্ধান্তে সরাসরি প্রভাবের মুখোমুখি। শুল্কটি বন্ডের আওতায় আনা পণ্য বা কাঁচামালের ওপর আরোপ করা হয় না, তবে নতুন শুল্কের আওতায় পড়া পণ্যগুলোকে আইন অনুসারে চালু করতে হবে। এই শর্ত পূরণে ব্যর্থ হলে ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলোকে আর্থিক ও আইনি সমস্যার সম্মুখীন হতে হতে পারে।
গত পাঁচ মাসে দেশের তৈরি পোশাক রপ্তানি ধারাবাহিকভাবে হ্রাস পেয়েছে, যা শুল্কের সম্ভাব্য প্রয়োগের সঙ্গে যুক্ত হয়ে রপ্তানি প্রবাহে বাধা সৃষ্টি করেছে। রপ্তানি হ্রাসের ফলে উৎপাদন পরিকল্পনা, কর্মসংস্থান এবং বৈদেশিক মুদ্রা আয় সবই প্রভাবিত হচ্ছে।
মোস্তফা আবিদ খান, যিনি পূর্বে বাংলাদেশ ট্রেড অ্যান্ড ট্যারিফ কমিশনের সদস্য ছিলেন, উল্লেখ করেছেন যে শুল্ক আরোপের আগে সম্পূর্ণ বিশ্লেষণ ও পরামর্শের প্রয়োজন। তিনি জোর দিয়ে বলেছেন যে, রপ্তানি বাধাগ্রস্ত না করার জন্য দ্রুত ও সঠিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা উচিত, নতুবা শিল্পের প্রতিযোগিতামূলক অবস্থান ক্ষতিগ্রস্ত হবে।
গতকালের বৈঠকে বাংলাদেশ টেক্সটাইল ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যাসোসিয়েশন (বিটিএমই) এর সহসভাপতি শামীম ইসলাম এবং অন্যান্য নেতারা শুল্কের প্রয়োজনীয়তা ও তার অর্থনৈতিক প্রভাব নিয়ে আলোচনা করেন। তারা যুক্তি দেন যে, শুল্ক না আরোপে কাঁচামালের খরচ নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব এবং রপ্তানি বাজারে বাংলাদেশের অবস্থান বজায় রাখা যাবে।
বিপরীতে, বাংলাদেশ গার্মেন্টস ম্যানুফ্যাকচারার্স ইন্ডাস্ট্রি (বিজিএমই) এর সভাপতি সেলিম রহমান এবং কেমিক্যাল ম্যানুফ্যাকচারার্স ইন্ডাস্ট্রি (কেমই) এর নির্বাহী সভাপতি ফজলে শামীম এহসান শুল্কের প্রয়োগের পক্ষে মত প্রকাশ করেন। তাদের মতে, দেশীয় উৎপাদনকে রক্ষা করার জন্য শুল্ক প্রয়োজন এবং এটি দীর্ঘমেয়াদে শিল্পের স্বনির্ভরতা বাড়াবে।
বৈঠকটি কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে পারেনি এবং শেষ পর্যন্ত আলোচনাকে ট্যারিফ কমিশনের হাতে ছেড়ে দেওয়া হয়। কমিশনকে বিষয়টি নিয়ে একটি সমীক্ষা পরিচালনা করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে, যাতে শুল্কের প্রভাব ও সম্ভাব্য বিকল্পগুলো বিশদভাবে মূল্যায়ন করা যায়।
বৈঠকের অধিনায়ক হিসেবে ট্যারিফ কমিশনের বর্তমান চেয়ারম্যান (অস্থায়ী) আবদুল গফুর উপস্থিত ছিলেন। তিনি সমীক্ষার সময়সীমা ও পদ্ধতি নির্ধারণের দায়িত্ব গ্রহণ করেন এবং সকল সংশ্লিষ্ট পক্ষকে সহযোগিতা করার আহ্বান জানান।
বিটিএমই এর শামীম ইসলাম এবং কেমই এর ফজলে শামীম এহসান উভয়ই উল্লেখ করেন যে, শুল্ক সংক্রান্ত বিষয়টি এখনো প্রাথমিক পর্যায়ে রয়েছে। তারা মিডিয়াকে অনুরোধ করেন যে, সমীক্ষা শেষ না হওয়া পর্যন্ত কোনো মন্তব্য না করা হয়, যাতে তথ্যের গোপনীয়তা ও বিশ্লেষণের স্বচ্ছতা বজায় থাকে।
শুল্কের সম্ভাব্য প্রয়োগের ফলে কাঁচামালের খরচ বাড়বে, যা শেষ পণ্যের মূল্যেও প্রভাব ফেলতে পারে। উৎপাদন খরচ বৃদ্ধি পেলে আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের কাছ থেকে দর কমে যাওয়ার ঝুঁকি থাকে, বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় বাজারে যেখানে মূল্য সংবেদনশীলতা বেশি। একই সঙ্গে, শুল্কের মাধ্যমে দেশীয় সুতা উৎপাদনকে উৎসাহিত করা হলে দীর্ঘমেয়াদে সরবরাহ শৃঙ্খল স্থিতিশীল হতে পারে।
অর্থনৈতিক বিশ্লেষকরা ইঙ্গিত দেন যে, শুল্ক নীতি স্পষ্ট না হলে বিনিয়োগকারীর আস্থা কমে যেতে পারে এবং নতুন প্রকল্পের পরিকল্পনা বিলম্বিত হতে পারে। অন্যদিকে, যদি শুল্কের হার যুক্তিসঙ্গতভাবে নির্ধারিত হয় এবং স্থানীয় উৎপাদনকে সমর্থন করে, তবে শিল্পের স্বনির্ভরতা বাড়বে এবং রপ্তানি বাজারে নতুন সুযোগ সৃষ্টি হতে পারে।
সারসংক্ষেপে, ভারতীয় সুতা আমদানিতে শুল্ক আরোপের প্রশ্নটি এখনো অনিশ্চিত অবস্থায় রয়েছে। ট্যারিফ কমিশনের সমীক্ষা ফলাফলের ওপর নির্ভর করে নীতি নির্ধারকরা চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেবে। ব্যবসায়িক সম্প্রদায়ের জন্য মূল বিষয় হল শুল্কের প্রয়োগের সময়সূচি, হার এবং এক্সসেপশন স্পষ্ট করা, যাতে উৎপাদন পরিকল্পনা ও রপ্তানি কৌশল পুনর্গঠন করা যায়। শুল্কের প্রভাব সম্পূর্ণভাবে বুঝে নিলে শিল্পের দীর্ঘমেয়াদী স্থায়িত্ব ও প্রতিযোগিতামূলকতা নিশ্চিত করা সম্ভব হবে।



