যশোরে বিএনপি নেতা আলমগীর হোসেনের গুলিবিদ্ধ হওয়ার মামলায় প্রধান সন্দেহভাজন ত্রিদিব চক্রবর্তী (মিশুক) আদালতে জবানবন্দি দিয়ে অপরাধ স্বীকার করেছেন। জবানবন্দি অনুযায়ী, তিনি শিকারের জামাতা বাসেদ আলীর (পরশ) পরিকল্পনা ও সরবরাহ করা বন্দুক ব্যবহার করে গুলি চালিয়ে হত্যা করেন। এই স্বীকারোক্তি আদালতে উপস্থাপনের পর, বিচারক অতিরিক্ত চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আছাদুল ইসলাম তাকে কারাগারে পাঠানোর আদেশ দেন।
গত বুধবার রাতের গভীরে যশোরের বেজপাড়া এলাকায় ত্রিদিবকে গ্রেপ্তার করা হয়। গ্রেপ্তারকালে তাকে চিরুনি কল এলাকার পুরোহিত মিহির চক্রবর্তী ত্রিনাথের পুত্র হিসেবে পরিচয় দেওয়া হয়। অতিরিক্ত পুলিশ সুপারভাইজার (অপরাধ) আবুল বাশার জানান, আলমগীর হোসেনের হত্যার মূল শুটার হিসেবে ত্রিদিবকে আটক করে আদালতে পাঠানো হয়েছে।
আবুল বাশার আরও উল্লেখ করেন, সিসিটিভি ক্যামেরা রেকর্ডে ত্রিদিবকে গুলি চালানোর সময় যে পোশাক পরা ছিল তা উদ্ধার করা হয়েছে এবং তা জব্দ করা হয়েছে। এই প্রমাণের ভিত্তিতে তদন্ত দল শিকারের গুলি চালানোর সরঞ্জাম ও পোশাকের সংযোগ স্থাপন করেছে।
আলমগীর হোসেনের হত্যাকাণ্ডের পটভূমি ৩ জানুয়ারি ২০২৬ রাতের শংকরপুর এলাকায় ঘটেছে। শিকারকে মোটরসাইকেল থেকে গুলি করে হত্যা করা হয় এবং গুলি চালানোর সময় শিকারের গাড়ি বা হেলমেটের কোনো চিহ্ন পাওয়া যায়নি। শিকারের স্ত্রী শামীমা, মৃতের পরিবারকে প্রতিনিধিত্ব করে, পরশ, সাগর এবং অজ্ঞাতনামা সহ একাধিক সন্দেহভাজনকে অপরাধী হিসেবে মামলায় অন্তর্ভুক্ত করেন।
মৃত আলমগীর হোসেন শংকরপুরের ইসহাক সড়কের ইন্তাজ চৌধুরীর পুত্র ছিলেন। তিনি যশোর পৌরসভার ৭ নম্বর ওয়ার্ডের বিএনপি যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক এবং নগর বিএনপির প্রাক্তন সদস্য হিসেবে পরিচিত ছিলেন। তার রাজনৈতিক কার্যক্রম ও স্থানীয় সংযোগের কারণে হত্যাকাণ্ডটি ব্যাপক দৃষ্টি আকর্ষণ করে।
হত্যার পরপরই ৪ জানুয়ারি পুলিশ শিকারের গুলি চালানোর ব্যক্তিকে শনাক্ত করতে ব্যর্থ হয়। তবে পরবর্তী তদন্তে সিসিটিভি ফুটেজ এবং স্থানীয় সাক্ষীদের বিবরণে শিকারের গুলি চালানোর সময়ের পোশাক ও গাড়ির ধরণ সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহ করা হয়েছে।
এই মামলায় তদন্তের প্রধান দিক হল শিকারের গুলি চালানোর অস্ত্রের উত্স ও জামাতার ভূমিকা। ত্রিদিবের জবানবন্দিতে স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছে যে জামাতা বাসেদ আলীর (পরশ) পরিকল্পনা ও সরবরাহ করা বন্দুক ব্যবহার করা হয়েছে। পুলিশ এই দিকটি নিশ্চিত করতে অতিরিক্ত ফরেনসিক বিশ্লেষণ চালিয়ে যাচ্ছে।
অধিকন্তু, ত্রিদিবের পরিবারিক পটভূমি তদন্তের নতুন দিক উন্মোচন করেছে। পুরোহিত মিহির চক্রবর্তী ত্রিনাথের পুত্র হওয়ায়, তার সামাজিক ও ধর্মীয় পরিচয় তদন্তে প্রাসঙ্গিক হতে পারে। তবে এখন পর্যন্ত কোনো ধর্মীয় সংঘাতের ইঙ্গিত পাওয়া যায়নি।
আসন্ন আদালত সেশন-এ ত্রিদিবের জবানবন্দি ও প্রমাণের ভিত্তিতে অতিরিক্ত শাস্তি নির্ধারণের সম্ভাবনা রয়েছে। বিচারিক প্রক্রিয়ার অগ্রগতি ও অতিরিক্ত অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে চালু থাকা মামলাগুলি একই সময়ে বিবেচনা করা হবে।
পুলিশের মতে, শিকারের গুলি চালানোর সময় ব্যবহৃত গুলি ও অস্ত্রের ধরণ বিশ্লেষণ করে আরও সন্দেহভাজনদের তালিকায় যুক্ত করা হবে। সিসিটিভি রেকর্ডে দেখা পোশাকের জব্দকৃত নমুনা ফরেনসিক ল্যাবের মাধ্যমে বিশ্লেষণ করা হচ্ছে।
এই ঘটনার পর, যশোরের নিরাপত্তা বাহিনী স্থানীয় এলাকায় অতিরিক্ত পেট্রোল চালু করেছে এবং নাগরিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সতর্কতা অবলম্বন করেছে। স্থানীয় প্রশাসন ও আইন প্রয়োগকারী সংস্থা একসাথে কাজ করে অপরাধের মূল সূত্র উন্মোচন ও দায়ী ব্যক্তিদের শাস্তি নিশ্চিত করার লক্ষ্যে কাজ করছে।
মামলার পরবর্তী ধাপ হিসেবে, শিকারের পরিবার ও সংশ্লিষ্ট রাজনৈতিক দলগুলো আদালতের রায়ের অপেক্ষায় রয়েছে। একই সঙ্গে, তদন্ত দল সিসিটিভি রেকর্ড, গুলি চালানোর অস্ত্রের ট্রেস এবং জামাতার সরবরাহকৃত বন্দুকের উৎস নির্ণয়ে কাজ চালিয়ে যাচ্ছে।
এই ধারাবাহিক তদন্তের ফলাফল ভবিষ্যতে অনুরূপ অপরাধের প্রতিরোধে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে বলে আশা করা হচ্ছে।



