উত্তরাখণ্ডের দেরাদুনে এমবিএ পড়াশোনা করা ত্রিপুরার নাগরিক অ্যাঞ্জেল চাকমা এবং তার ভাই ৯ ডিসেম্বর রাতের বাজারে গিয়েছিলেন। সেখানে একটি স্ব-ঘোষিত ‘সংখ্যাগুরু’ গোষ্ঠীর কয়েকজন যুবক তাদের দিকে ‘চিনিক’, ‘চাইনিজ’ ইত্যাদি শব্দ ব্যবহার করে অপমানের সূচনা করেন। অ্যাঞ্জেল তৎক্ষণাৎ জানিয়ে দেন যে তিনি চীনা নন, ভারতীয় এবং এই ধরনের উল্লেখ তার পরিচয়কে আঘাত করে। তার এই বিরোধপূর্ণ মন্তব্যের পরই যুবকরা শারীরিক হিংসা চালান, যার মধ্যে ছুরিকাঘাত এবং বেধড়ক মারপিট অন্তর্ভুক্ত। তার ভাইও আঘাতপ্রাপ্ত হন, তবে অ্যাঞ্জেল গুরুতর অবস্থায় হাসপাতালে ভর্তি হন। চিকিৎসার পরেও তার শারীরিক অবস্থা অবনতির দিকে গতি নেয় এবং ২৫ ডিসেম্বর তিনি মৃত্যুবরণ করেন। মৃত্যুর মুহূর্তে তিনি শেষবারও ‘আমি চাইনিজ না, ভারতীয়’ বলে নিজের দেশপ্রেম প্রকাশ করেন।
স্থানীয় পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌঁছে দ্রুতই FIR দাখিল করে এবং হিংসা ঘটানো সন্দেহভাজনদের গ্রেফতার করার নির্দেশ দেয়। তদন্তের অংশ হিসেবে গোষ্ঠীর সদস্যদের পরিচয় ও তাদের পূর্বে কোনো অপরাধের রেকর্ড আছে কিনা তা যাচাই করা হচ্ছে। বর্তমানে তদন্তাধীন মামলায় সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে হিংসা, আত্মহত্যা প্রচার এবং গোষ্ঠীভুক্ত অপরাধের অভিযোগ আনা হবে।
অ্যাঞ্জেল চাকমার মৃত্যুর পর উত্তর-পূর্বের বিভিন্ন রাজ্যের নাগরিক সংগঠন ও মানবাধিকার গোষ্ঠী প্রতিবাদসূচক র্যালি ও সমাবেশের মাধ্যমে ন্যায়বিচার দাবি করেন। তারা উল্লেখ করেন যে ত্রিপুরা ও অন্যান্য চট্টগ্রাম-সম্প্রদায়ের মানুষ দীর্ঘদিনের বর্ণবাদী বর্ণনা ও বৈষম্যের শিকার হয়ে আসছে, এবং এই ঘটনার মাধ্যমে সবার দৃষ্টিতে এই সমস্যার তীব্রতা স্পষ্ট হয়েছে। কিছু রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী ও কেন্দ্রীয় সরকারের প্রতিনিধিরা ঘটনাটির প্রতি গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে, দ্রুত তদন্ত ও ন্যায়সঙ্গত শাস্তি নিশ্চিত করার আহ্বান জানান।
অন্যদিকে, বাংলাদেশে এই ঘটনার প্রতি জনসাধারণের প্রতিক্রিয়া তুলনামূলকভাবে কম দেখা যায়। একই সময়ে, বাংলাদেশে ঘটে যাওয়া দীপু দাশের হত্যাকাণ্ডের তুলনায় অ্যাঞ্জেল চাকমার মামলায় তেমন কোনো বৃহৎ প্রতিবাদ বা সামাজিক আন্দোলন গড়ে ওঠেনি। দেশের প্রধানমাধ্যমিক সংস্থা ও রাজনৈতিক দলগুলো এই বিষয়টি নিয়ে বিশেষভাবে মন্তব্য করেনি। বিশ্লেষকরা উল্লেখ করেন যে, বাংলাদেশি মিডিয়া ও সমাজ সাধারণত ভারতের অভ্যন্তরীণ বিষয়গুলোকে দূরত্ব বজায় রেখে থাকে, যা দেশের পররাষ্ট্রনীতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ বলে বিবেচিত হয়।
আইনি দৃষ্টিকোণ থেকে, হিংসা ও বর্ণবাদী অপরাধের বিরুদ্ধে কঠোর শাস্তি প্রদান করা অপরিহার্য বলে আইন প্রয়োগকারী সংস্থা জোর দিয়েছে। সংশ্লিষ্ট আইন অনুযায়ী, হিংসা, আত্মহত্যা প্রচার এবং গোষ্ঠীভুক্ত অপরাধের জন্য সর্বোচ্চ ১০ বছর পর্যন্ত কারাদণ্ডের পাশাপাশি জরিমানা আরোপ করা হতে পারে। তদন্তের অগ্রগতি ও আদালতের রায়ের অপেক্ষায় রয়েছে, যাতে অপরাধীদের যথাযথ শাস্তি নিশ্চিত করা যায় এবং ভবিষ্যতে অনুরূপ ঘটনা রোধ করা যায়।
এই ঘটনা ত্রিপুরা ও উত্তর-পূর্বের বর্ণবাদবিরোধী আন্দোলনের জন্য নতুন দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে। স্থানীয় সমাজের মধ্যে জাতীয় পরিচয় ও গর্বের প্রতি দৃঢ়তা প্রকাশের মাধ্যমে, অ্যাঞ্জেল চাকমা শেষ মুহূর্তে যে বার্তা দিয়েছেন তা বহু মানুষের হৃদয়ে প্রভাব ফেলেছে। তার মৃত্যুর পরেও, তার আত্মবিশ্বাস ও দেশপ্রেমের কথা বহু তরুণের জন্য অনুপ্রেরণা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
প্রতিবাদ ও ন্যায়বিচারের দাবি ছাড়াও, সরকার ও আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলোর কাছ থেকে এই ধরনের বর্ণবাদী হিংসা রোধে কার্যকর নীতি ও সচেতনতা কর্মসূচি চালু করার আহ্বান করা হচ্ছে। বিশেষ করে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, সামাজিক সংগঠন এবং মিডিয়ার ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ, যাতে সমাজের সকল স্তরে সমতা ও সহনশীলতার সংস্কৃতি গড়ে ওঠে। অ্যাঞ্জেল চাকমার কষ্টদায়ক মৃত্যু একটি সতর্কবার্তা হিসেবে কাজ করবে, যা ভবিষ্যতে জাতিগত বৈষম্য ও হিংসা মোকাবিলায় দৃঢ় পদক্ষেপের প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরবে।



