ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি কহামেনি তেহরানে একাধিক মিত্রের বিচ্ছেদ এবং অভ্যন্তরীণ অস্থিরতার মুখোমুখি। সাম্প্রতিক সময়ে ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোর যুক্তরাষ্ট্রের আদালতে হাজির হওয়া ইরানের কূটনৈতিক নেটওয়ার্কে তীব্র কম্পন সৃষ্টি করেছে। এই ঘটনার পেছনে ইরানের দীর্ঘদিনের মিত্রতা এবং যুক্তরাষ্ট্রের আঞ্চলিক নীতি সংঘর্ষের প্রভাব রয়েছে।
কহামেনির মিত্রতা ক্ষয়প্রাপ্তির সূচনা গত বছর সিরিয়ার প্রেসিডেন্ট বাশার আল-আসাদকে ক্ষমতাচ্যুত হওয়া থেকে রক্ষা করতে ব্যর্থতা হিসেবে বিশ্লেষকরা উল্লেখ করে। তেহরানের নিরাপত্তা নীতি এবং অঞ্চলের শক্তি ভারসাম্য রক্ষার প্রচেষ্টা ব্যর্থ হওয়ায় ইরানের প্রভাবের পরিধি সংকুচিত হয়েছে।
ইসরায়েলি আক্রমণের ধারাবাহিকতা ইরানের ‘রেজিস্ট্যান্স ফ্রন্ট’কে একের পর এক ক্ষতিগ্রস্ত করেছে। লেবাননের হিজবুল্লাহকে কার্যত নিরস্ত্রীকরণের পথে ঠেলে দেওয়া হয়েছে, যা ইরানের আঞ্চলিক কৌশলকে দুর্বল করেছে। এই আক্রমণগুলো ইরানের সামরিক ক্ষমতার সীমা প্রকাশ করেছে।
ভেনেজুয়েলা থেকে সর্ববৃহৎ আঘাতটি নিকোলাস মাদুরোর যুক্তরাষ্ট্রের আদালতে উপস্থিতি। দীর্ঘদিনের মিত্র হিসেবে ইরানকে সমর্থনকারী মাদুরো এখন আন্তর্জাতিক আইনি প্রক্রিয়ার মুখোমুখি, যা তেহরানের কূটনৈতিক প্রভাবকে হ্রাস করেছে। ইরানের অভ্যন্তরে এই ঘটনার প্রতিক্রিয়া তীব্র উদ্বেগের স্রোত সৃষ্টি করেছে।
ইরানের অভ্যন্তরে অর্থনৈতিক সংকট তীব্রতর হয়েছে; মুদ্রার অবমূল্যায়ন, বেকারত্ব এবং মৌলিক পণ্যের ঘাটতি জনসাধারণের অসন্তোষ বাড়িয়ে তুলেছে। রাস্তায় ব্যাপক প্রতিবাদ এবং শ্রমিকদের ধর্মঘট সরকারকে কঠিন অবস্থায় ফেলেছে।
পশ্চিমা বিশ্লেষকরা ইরানের শাসনব্যবস্থার স্থিতিশীলতা নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করেছে, যদিও তেহরান সরকার দাবি করে যে বাহ্যিক চাপের মুখেও তারা অটল থাকবে। ইরানের নিরাপত্তা বাহিনী এবং সরকারী সংস্থা সব ধরনের হুমকির মোকাবেলায় প্রস্তুত থাকার ঘোষণা দিয়েছে।
গত বছর ইরান ও ইসরায়েল, যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে ১২ দিনের সামরিক সংঘর্ষে ইরান নিজেকে বিজয়ী হিসেবে উপস্থাপন করলেও পশ্চিমা পক্ষের দৃষ্টিতে ফলাফলটি বিপরীতভাবে ব্যাখ্যা করা হয়েছে। উভয় পক্ষের বর্ণনা পারস্পরিক বিরোধপূর্ণ অবস্থায় রয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের প্রাক্তন প্রেসিডেন্টের প্রশাসন ভেনেজুয়েলা অপারেশনকে সফল বলে দাবি করে, এবং তা ইরানের পূর্বের হামলার সঙ্গে তুলনা করে হুমকি বাড়িয়ে তুলেছে। বিশ্লেষকরা উল্লেখ করেন যে এই তুলনা ইরানের কূটনৈতিক কৌশলে নতুন উদ্বেগের সঞ্চার করেছে।
রাশিয়া ও চীন, যাদের ইরানের কূটনৈতিক ও অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে, এই সংকটে তুলনামূলকভাবে নীরব অবস্থান বজায় রেখেছে। তাদের অপ্রতিক্রিয়াশীলতা ইরানের কৌশলগত বিকল্পকে সংকুচিত করেছে।
ইরানের কঠোরপন্থী দলগুলো এখন সামরিক ও আর্থিক শক্তির ওপর নির্ভর করে টিকে থাকার পথ দেখছে। তারা বিশ্বাস করে যে বাহ্যিক হুমকি মোকাবেলায় এই দুই ক্ষেত্রই মূল চাবিকাঠি।
অন্যদিকে, দেশের পশ্চিমমুখী ও উদারমত গোষ্ঠী সরকারের বৈধতা জনগণের সমর্থন থেকে আসতে হবে বলে জোর দিচ্ছে। তারা যুক্তি দেয় যে আন্তর্জাতিক হস্তক্ষেপের ফলে ইরানের সাধারণ মানুষের মধ্যে নতুন আশার সঞ্চার হয়েছে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কহামেনির বিরোধী মন্তব্য এবং হাস্যকর পোস্টের সংখ্যা বাড়ছে। ব্যবহারকারীরা মজার ছলে সরকারের নীতি ও নেতৃত্বের দুর্বলতা তুলে ধরছে, যা জনমত গঠনে নতুন মাত্রা যোগ করেছে।



